হুমায়ূন আহমেদের জীবনী

0
42
humayun-ahmed

হুমায়ূন আহমেদের ছিলেন একজন বাংলাদেশী  স্বনামধন্য এবং কিংবদন্তীতুল্য সাহিত্যিক, লেখক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার, গীতিকার, চিত্রনাট্যকার  এবং চলচ্চিত্র রচয়িতা, তিনি বাংলা সাহিত্যে বিংশ শতাব্দীর জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম একজন ব্যক্তিত্ব।

হুমায়ূন আহমেদের জন্ম

হুমায়ূন আহমেদ ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ফয়জুর রহমান আহমেদ এবং মা আয়েশা আখতার খাতুন। তার রচিত আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা থেকে জানা যায় ছেলেবেলা হুমায়ূন আহমেদের নাম ছিল শামসুর রহমান। ডাকনাম ছিল কাজল, যা পরবর্তীতে হুমায়ূন আহমেদ রাখা হয়।

হুমায়ূন আহমেদের শিক্ষাজীবন

কর্মসূত্রে হুমায়ূন আহমেদের পিতা একজন সরকারি চাকরিজীবী হওয়াতে পরিবারের সাথে তাকে দেশের বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে থাকতে এবং পড়াশোনা করতে হয়েছে, তবে ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী এবং সংস্কৃতিমনস্ক একজন তরুণ।

  • 1959 সালে তার শিক্ষাজীবন আরম্ভ হয় কিশোরী মোহন পাঠশালায় (সিলেট)।
  • 1963 সালে তিনি বগুড়া জিলা স্কুলে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছিলেন (বগুড়া)।
  • 1965 সালে তিনি মেট্রিক পরীক্ষায় রাজশাহী বোর্ড থেকে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে ছিলেন।
  • তিনি পরবর্তীতে ঢাকা কলেজে ভর্তি হন, সেখানে বিজ্ঞান বিভাগে অধ্যয়ন করে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করেন।
  • হুমায়ূন আহমেদ পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তিনি রসায়ন শাস্ত্রে পড়াশোনা করেন, এখান থেকে তিনি প্রথম শ্রেণীতে বিএসসি (সম্মান) ও এমএসসি ডিগ্রী প্রাপ্ত করেন।
  • হাজী মুহাম্মদ মহসিন হলের সাথে হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতিবিজড়িত রয়েছে, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার সময় এই হলেই আবাসিক ছাত্র হিসেবে ছিলেন, হাজী মোহাম্মদ মহসীন হলে তার কক্ষ নাম্বারটি ছিল 564 নাম্বার।

হুমায়ূন আহমেদের বিবাহ

হুমায়ূন আহমেদ ১৯৭৩ সালে গুলতেকিন খানকে বিয়ে করেন। তাদের তিন মেয়ে এবং দুই ছেলে, যার মধ্যে একজন অকালে মারা যায়। ২০০৩ সালে গুলতেকিনের সঙ্গে তার বিচ্ছেদ হয় এবং ঐ বছরই তিনি তার নাটক চলচ্চিত্র অভিনেত্রী শাওনকে বিয়ে করেন। তাদের তিন ছেলেমেয়ে জন্মগ্রহণ করে, প্রথম ভূমিষ্ঠ কন্যাটি মারা যায়।

Humayun Ahmed Family Wife Child

হুমায়ুন আহমেদের পরিবার

সাহিত্য সৃষ্টির সূচনার সময়কাল

১৯৭২ সালে যখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সেই সময় তার ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাস এর মাধ্যমে সাহিত্য জগতে আগমন ঘটে। বাংলা সাহিত্যকে তার কলমের ছোয়ায় অনেক উপহার দিয়েছেন তিনি। তার সৃষ্ট হিমু এবং মিসির আলি জনপ্রিয় চরিত্র।

ছোট থেকে গল্প-উপন্যাসের প্রতি এক অসম্ভব টান ছিল তার। তবে তাকে সাহিত্য অনুরাগী করে তোলার পিছনে তাঁর পরিবারের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা ছিল তার বাবার, বাড়িতে সাহিত্যের আসর বসত।তার বড় মামাও কবিতা, নাটক লিখতেন।

১৯৭২ সালে প্রকাশিত ‘নন্দিত নরকে’র ভূমিকা লিখেছিলেন বাংলা ভাষাশাস্ত্র পন্ডিত আহমদ শরীফ, যা পাঠক শ্রেণীর মনে এক কৌতূহল সৃষ্টি করে। তিনি আধুনিক বাংলা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর পথিকৃৎ এবং বাংলা কথাসাহিত্যে সংলাপপ্রধান নতুন শৈলীর জনক। তিনি শুধুমাত্র ঔপন্যাসিকই নন একাধারে ছোটগল্পকার, নাট্যকার, গীতিকার, চিত্রনাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা।

টেলিভিশন নির্মাতা

নওয়াজিশ  আলি খান হুমায়ুন আহমেদ কে আহবান করেন নাটক লেখার জন্য। ১৯৮৩ সালে নওয়াজিশ আলি খানের পরিচালনায় তার প্রথম টেলিভিশন নাটক ‘প্রথম প্রহরে’ই নাটকটি ব্যাপক সাফল্য পেলে নওয়াজিশ আলি খানের পরিচালনায় হুমায়ূন আহমেদের রচিত অযাত্রা, বিবাহ, অসময়, নিমফুল, নাটকের প্রযোজনা করেন। হুমায়ূন আহমেদ রচিত প্রথম ধারাবাহিক নাটক ‘এইসব দিনরাত্রি’।

তার অন্যতম ধারাবাহিক নাটক গুলি হল- একদিন হঠাত্’, ‘এবং আইনস্টাইন’, ‘আজ জরির বিয়ে’, ধারাবাহিক ‘আজ রবিবার’, ‘একটি অলৌকিক ভ্রমণ কাহিনি’, ‘এই বৈশাখে’, ‘এই বর্ষায়’, ধারাবাহিক ‘এইসব দিনরাত্রি’, সিক্যুয়েল ‘আমরা তিন জন’, ধারাবাহিক ‘অয়ময়’, ‘অন্তরার বাবা’, ‘আংটি’, ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল’, ‘বাদল দিনের গান’, ‘ব্যাংক ড্রাফট’, ‘ভূত বিলাস’, ‘বিবাহ’, ‘বন কুমারী’, ‘বন বাতাসি’, ‘বৃহন্নলা’, ধারাবাহিক ‘বহুব্রীহি’, ‘বন্য’, ‘বউ বিলাস’, ‘চাঁদের আলোয় কয়েকজন যুবক’, ‘চেরাগের দৈত্য’, ‘চিপা ভূত’, ‘ছেলে দেখা’, ‘চোর’, ‘চৈত্র দিনের গান’, ‘চন্দ্রগ্রহণ’, ‘চন্দ্র কারিগর’, ‘চন্দ্রগ্রস্ত’, ‘দূরত্ব’, ‘দুই দুকোনে চার’, ‘একা’, ‘এ কী কাণ্ড’, ‘এনায়েত আলীর ছাগল’, ‘গণি সাহেবের শেষ কিছুদিন’, ‘গন্ধ’, ‘গৃহ সুখ প্রাইভেট লিমিটেড’, ‘গুণীন’, ‘হাবিবের সংসার’, ‘হাবলঙ্গের বাজার’, ‘হামিদ মিয়ার ইজ্জত’, সিক্যুয়াল ‘হিমু’, ‘ইবলিশ’, ‘জহির কারিগর’, ‘জীবন যাপন’, ‘জোত্স্নার ফুল’, ‘জুতা বাবা’, ‘জুতার বাক্স’, ‘জইতুরি’, ‘যমুনার জল দেখতে কালো’, ‘জল তরঙ্গ’, ‘জলে ভাসা পদ্ম’, ধারাবাহিক ‘কালা কইতর’, ‘কাকারু’, ‘খোয়াব নগর’, ধারাবাহিক ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘কন্যা দেখা’, ‘কূহুক’, ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই’, ধারাবাহিক ‘মেঘ বলছে যাব যাব’, ‘মিসকল’, ‘মফিজ মিয়ার চরিত্র’, ‘মন্ত্রী মহোদয়ের আগমন’, ‘নাট্য মঙ্গলের কথা’, ‘নিম ফুল’, ‘নগরে দ্বৈত্য’, ধারাবাহিক ‘নীতু তোমাকে ভালোবাসি’, ‘নূরুদ্দিন স্বর্ণপদক’, ধারাবাহিক ‘অচীন রাগিনী’, ‘অনুসন্ধান’, ‘ওপেন্টি বায়োস্কোপ’, ‘অপরাহ্ন’, ‘অতঃপর শুভ বিবাহ’, ‘পাপ’, ‘পাথর’, ‘প্রজেক্ট হিমালয়’, ‘পদ্ম’, ‘পুষ্পকথা’, ধারাবাহিক ‘রুমালী’, ‘রূপকথা’, ‘রূপার ঘণ্টা’, ধারাবাহিক ‘রূপালি রাত্রি’, ‘সোনার কলস’, ‘সবাই গেছে বনে’, ‘শওকত সাহেবের গাড়ি কেনা’, ‘রুবিক্স কিউব’, ধারাবাহিক রুপালি নক্ষত্র’, ‘স্বপ্ন এবং স্বপ্ন ভঙ্গ’, ইত্যাদি।

চলচ্চিত্র নির্মাণ

জনপ্রিয় সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ চলচ্চিত্র নির্মাণেও সফল হয়েছিলেন। চলচ্চিত্র নির্মাণে তার যাত্রা শুরু হয় ১৯৯২ সালে। চলচ্চিত্র পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান হুমায়ুন আহমেদের ‘শঙ্খনীল কারাগার’ উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়ন করেন। চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে তাঁর যাত্রা শুরু ১৯৯৪ সালে ‘ আগুনের পরশমনি’ থেকে।

‘আগুনের পরশমনি’ মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র। এরপর ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ চলচ্চিত্রে তার রচিত ‘একটা ছিল সোনার কন্যা’ এবং ‘আমার ভাঙ্গা ঘরে’ গানটি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে। তার জনপ্রিয় চলচ্চিত্র গুলি হল- ‘দুই দুয়ারী’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘চন্দ্রকথা’, ‘নয় নম্বর বিপদ সংকেত’ ‘আমার আছে জল’ এবং সর্বশেষ অর্থাৎ অষ্টম চলচ্চিত্র ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ তার মৃত্যুর পরে ২০১২ সালে মুক্তি পায়।

পুরস্কার

বাংলা সাহিত্যে বিভিন্ন দিকে তাঁর সৃষ্টির অবদানের জন্য তিনি বিভিন্ন পুরস্কার লাভ করেছেন। কথা সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি ১৯৭৩ সালে লেখক শিবির পুরস্কার  পান, ১৯৮১ সালে বাংলার উপন্যাসে অবদানের জন্য বাংলা একাডেমী পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৮৭ সালে মাইকেল মধুসূদন পদক এ সম্মানিত হয়। ১৯৯০ সালে  হুমায়ূন কাদির স্মৃতি পুরস্কার পান। ১৯৯২ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

‘ শঙ্খনীল কারাগার’ চলচ্চিত্রের জন্য। ১৯৮৮ সালে বাচসাস পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়াও আরও অনেক পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন তিনি।

নুহাশ পল্লী পরিচিতি

হুমায়ূন আহমেদের প্রতিষ্ঠা করা গ্রাম নুহাশ পল্লী যা কিনা ঢাকার অদূরে গাজীপুর জেলার  পিরুজ আলী গ্রামে অবস্থিত, আয়তনের দিক থেকে 40 বিঘা এই গ্রামটি হুমায়ূন আহমেদ তার নিজের মত করে প্রাকৃতিক নৈসর্গিক সাজে সাজিয়ে তুলেছিলেন বলে জানা যায়।

এখানে বিভিন্ন শত প্রজাতির দুর্লভ বনজ, ঔষধি ও ফলমূলের কাছে রয়েছে, প্রতিটি গাছের জীবন পরিচয় তুলে ধরার জন্য গাছের গায়ে সুন্দর করে ফলক লাগানো রয়েছে, এখানে একটি বিশাল বড় আকারের দিঘি রয়েছে, দিঘির মাঝখানে একটি ছোট দ্বীপ সুন্দর ভাবে বিভিন্ন গাছপালা সাজিয়ে রাখা হয়েছে।

এখানে বেশ কিছু বাংলো বাড়ি রয়েছে যার একটির নাম ভূত বিলাস, আরো বিভিন্ন দৃষ্টিনন্দন এবং আকর্ষণীয় অনেক কিছুই রয়েছে এখানে যা পর্যটকদের আকর্ষণ করে।

সারাবছর এখানে টিকিটের মাধ্যমে পর্যটন করা গেলেও বছরে দুদিন এই গ্রামটিকে  সকল দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়  আর সেই দুটো দিন হচ্ছে বিখ্যাত বাঙালি লেখক হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যু দিবস এবং জন্ম দিবস।

হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যু

সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে হুমায়ূন আহমেদের ওপেন হার্ট সার্জারি হয়েছিল, নিয়মিত চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে থাকাকালীনই একটি চেকআপে হুমায়ূন আহমেদের ক্যান্সার ধরা পড়ে।

14 সেপ্টেম্বর 2011 সালে হুমায়ূন আহমেদ চিকিৎসার জন্য নিউ ইয়র্ক শহরে পাড়ি দেন, এখানে তাকে মেমোরিয়াল স্লেন-কেটারিং ক্যান্সার সেন্টারে নিয়ে আসা হয়েছিল।

12 মে 2012 তে তিনি দুই সপ্তাহের জন্য বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলেন, আর চিকিৎসা চলাকালীন 19 জুলাই 2012 সালে হুমায়ূন আহমেদ আমেরিকার নিউ ইয়র্ক সিটির বেলভিউ হাসপাতালে মারা যান।