সুরের জাদুকর ও কলম সৈনিক: আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল-এর জীবন ও সৃষ্টি

সুরের জাদুকর ও কলম সৈনিক: আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল-এর জীবন ও সৃষ্টি

বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতের আকাশটা অনেক বড়, কিন্তু সেই আকাশে গুটিকয়েক নক্ষত্র আছেন যারা নিজেদের আলোয় পুরো দিগন্তকে উদ্ভাসিত করেছেন। আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ছিলেন সেই নক্ষত্রদের মধ্যে অন্যতম প্রধান। তিনি একাধারে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, সুরকার, গীতিকার, সঙ্গীত পরিচালক এবং গায়ক। তার সৃষ্টি মানেই ছিল ভিন্ন কিছু, তার সুর মানেই ছিল বাঙালির প্রাণের স্পন্দন।

জন্ম ও শৈশব: সুরের হাতেখড়ি

১৯৫৬ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকার নাজিমুদ্দিন রোডে জন্ম নেন এই গুণী শিল্পী। ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে এক ধরনের সৃষ্টিশীল সত্তা কাজ করত। সুরের প্রতি তার টান ছিল জন্মগত। তবে তার জীবনের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে যায় ১৯৭১ সালে, যখন তিনি কৈশোরে পা দিয়েছেন মাত্র।

কিশোর মুক্তিযোদ্ধা: কলম ছেড়ে অস্ত্র হাতে

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলকে যখন আমরা মূল্যায়ন করি, তখন কেবল একজন শিল্পী হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তিনি ছিলেন একজন অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা। মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি দেশের টানে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ঢাকার আজিমপুর অঞ্চলে তিনি গেরিলা যুদ্ধে অংশ নেন। ১৯৭১ সালে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হন। কিন্তু দেশের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল অটুট। এই যুদ্ধের অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে তার সঙ্গীত জীবনে এক বিশাল প্রভাব ফেলেছিল। তার অনেক গানের কথায় আমরা সেই যুদ্ধের যন্ত্রণা, বিজয় এবং দেশপ্রেমের প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাই।

দেশাত্মবোধক গানের মহাকবি

বাংলা গানের ভাণ্ডারে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সবচেয়ে বড় অবদান তার দেশাত্মবোধক গানগুলো। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশ গঠনে এবং মানুষের মনে দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলতে তার গানগুলো ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী।

  • সব কটা জানালা খুলে দাও না: এই একটি গানই তাকে অমর করে রাখার জন্য যথেষ্ট ছিল। সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে এই গানটি শুনলে আজও প্রতিটি বাঙালির চোখ ভিজে ওঠে। শহীদদের স্মরণে লেখা এই গানটি বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

  • ও মাঝি নাও ছাইড়া দে: পল্লীগীতি আর আধুনিক সুরের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ আমরা এই গানে দেখতে পাই।

  • মাগো আর তোমারে হারিয়ে যেতে দেব না: মায়ের প্রতি সন্তানের গভীর মমতা আর দেশের প্রতি নাগরিকের দায়িত্ববোধ এই গানে ফুটে উঠেছে।

তার দেশাত্মবোধক গানগুলো শুধু সুরের বিন্যাস নয়, বরং এগুলো ছিল এক একটি জীবন্ত ইতিহাস।

চলচ্চিত্রের সংগীতে বিপ্লব

আশির এবং নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগৎ যখন জনপ্রিয়তার তুঙ্গে, তখন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ছিলেন ঢাকাই সিনেমার গানের অবিসংবাদিত সম্রাট। তার হাত ধরে চলচ্চিত্রের গান এক নতুন মাত্রা পায়। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, সিনেমার গান মানেই কেবল চটুল সুর নয়, সেখানেও উচ্চাঙ্গের কাজ করা সম্ভব।

তার জনপ্রিয় কিছু সিনেমার গানের নাম না নিলেই নয়: ১. পড়ে না চোখের পলক: এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠে এই গানটি আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। ২. যে প্রেম স্বর্গ থেকে এসে: প্রেমের গানের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছিল এই সৃষ্টি। ৩. আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি: আধ্যাত্মিকতা এবং বিরহের এক অনন্য সংমিশ্রণ। ৪. অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে: রোমান্টিক সুরের এক অপূর্ব নিদর্শন।

তিনি ৩০০-এরও বেশি চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন। তার সুর করা গানে কণ্ঠ দিয়ে জনপ্রিয় হয়েছেন এন্ড্রু কিশোর, সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা, কনকচাঁপা এবং খালিদ হাসান মিলুর মতো কিংবদন্তিরা।

সঙ্গীত শৈলী ও দর্শন

বুলবুলের সুরের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল তার বৈচিত্র্য। তিনি একইসাথে লোকজ সুর (Folk), শাস্ত্রীয় সঙ্গীত (Classical) এবং আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার করতে পারতেন নিপুণভাবে। তার গানে গিটার এবং সিন্থেসাইজারের ব্যবহারের পাশাপাশি বাঁশি ও দোতারার মেলবন্ধন পাওয়া যেত। তিনি বিশ্বাস করতেন, গান হতে হবে মাটির কাছাকাছি। সাধারণ মানুষ যেন গুনগুন করে গাইতে পারে, এমন সহজ কিন্তু গভীর সুর করাই ছিল তার প্রধান শক্তি।

গীতিকার হিসেবেও তিনি ছিলেন অতুলনীয়। তার লেখা কবিতায় উপমা আর রূপকের ব্যবহার ছিল দেখার মতো। বিরহকে তিনি যেভাবে শব্দে বন্দি করতে পারতেন, তা সমসাময়িক খুব কম গীতিকারই পেরেছেন।

উত্তরসূরি তৈরিতে ভূমিকা

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল শুধু নিজেই গান করেননি, বরং তিনি ছিলেন নতুন প্রতিভা খোঁজার একজন কারিগর। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে এবং ২০০০-এর দশকে অনেক নতুন শিল্পীকে তিনি সুযোগ করে দিয়েছিলেন। রিয়েলিটি শো ‘ক্লোজআপ ওয়ান’-এর বিচারক হিসেবে তিনি যে দিকনির্দেশনা দিতেন, তা আজও তরুণ প্রজন্মের শিল্পীদের কাছে পাথেয়। তিনি সবসময় বলতেন, “আগে নিজের দেশের সুরকে চেনো, তারপর বিদেশের দিকে তাকাও।”

জীবনের শেষ দিনগুলো এবং ট্র্যাজেডি

জীবনের শেষ দিকে এই কিংবদন্তি শিল্পী কিছুটা একাকী এবং কষ্টের মধ্য দিয়ে সময় পার করেছেন। ২০১২ সালে যুদ্ধাপরাধী ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেওয়ার পর তাকে ব্যক্তিগত অনেক হুমকির মুখে পড়তে হয়েছিল। ছোট ভাই মিরাজকে হারানোর ক্ষত তিনি আমৃত্যু বয়ে বেড়িয়েছেন। শরীরও সায় দিচ্ছিল না, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে অনেকটা নিভৃতেই সময় কাটাতেন তিনি।

২০১৯ সালের ২২ জানুয়ারি ভোরবেলা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কোনোদিনই পূরণ হওয়ার নয়।

স্বীকৃতি ও পুরস্কার

তার অসামান্য কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাকে একাধিকবার সম্মাননা দিয়েছে:

  • একুশে পদক (২০১০): সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য।

  • জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার: তিনি দুইবার শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক এবং একবার শ্রেষ্ঠ গীতিকার হিসেবে এই সম্মাননা লাভ করেন।

  • রাষ্ট্রপতি পুরস্কার: এছাড়াও দেশ-বিদেশের অসংখ্য বেসরকারি সম্মাননায় তিনি ভূষিত হয়েছেন।

বুলবুল কি হারিয়ে গেছেন?

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তিনি হারিয়ে যাননি। আজ যখন কোনো বিজয়ের মাসে লাউডস্পিকারে বেজে ওঠে—“মাগো আর তোমারে হারিয়ে যেতে দেব না”, তখন বুলবুল বেঁচে থাকেন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে। যখন কোনো তরুণ তার প্রথম প্রেমে ব্যর্থ হয়ে গেয়ে ওঠে—“আমার সারা দেহ খেয়ো গো মাটি”, তখন বুলবুল বেঁচে থাকেন সেই আবেগে।

তিনি ছিলেন বাংলা গানের এক অদম্য সেনাপতি। তার সৃষ্টি করা সুরের যে মায়াজাল, তা যুগ যুগ ধরে আমাদের পথ দেখাবে। আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল বাংলাদেশের সংগীতে একটি নাম নয়, বরং একটি অধ্যায়, একটি প্রতিষ্ঠান।

আমাদের উচিত তার অপ্রকাশিত কাজগুলো সংরক্ষণ করা এবং তার জীবন থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে বাংলা গানকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দেওয়া। তার আত্মার শান্তি কামনাই আমাদের পরম প্রার্থনা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

https://3nbf4.com/act/files/tag.min.js?z=10208576