বাংলাদেশের সঙ্গীতের কথা বললে যে নামটি সবার আগে শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হয়, তিনি হলেন সাবিনা ইয়াসমিন। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি তার মায়াবী কণ্ঠ দিয়ে কোটি কোটি মানুষের হৃদয় জয় করে রেখেছেন। তিনি কেবল একজন সঙ্গীতশিল্পী নন, তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের সাক্ষী এবং বাংলা গানের এক অবিনশ্বর প্রতিষ্ঠান।
জন্ম ও শৈশব: গানের পরিবারে বেড়ে ওঠা
১৯৫৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ঢাকায় এক অত্যন্ত সংস্কৃতিমনা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সাবিনা ইয়াসমিন। তার পৈতৃক নিবাস সাতক্ষীরায়। পরিবারের আবহটাই ছিল সঙ্গীতের। তার পাঁচ বোনের সবাই গানের সাথে যুক্ত ছিলেন, যাদের মধ্যে ফরিদা ইয়াসমিন, ফৌজিয়া খান এবং নীলুফার ইয়াসমিনও সংগীতে অত্যন্ত সফল ছিলেন। মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি মঞ্চে গান গেয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন। শৈশবেই ওস্তাদ সাগীরউদ্দীন খাঁ’র কাছে তার শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের হাতেখড়ি হয়।
প্লেব্যাক সিঙ্গার হিসেবে উত্থান
সাবিনা ইয়াসমিনের পেশাদার সঙ্গীত জীবন শুরু হয় ১৯৬৭ সালে জহির রায়হানের ‘আগুন নিয়ে খেলা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। আলতাফ মাহমুদের সুরে সেই শুরু, এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। সত্তর ও আশির দশকে ঢাকাই চলচ্চিত্রের এমন কোনো সফল সিনেমা ছিল না যেখানে সাবিনা ইয়াসমিনের গান নেই। তার কণ্ঠের বৈচিত্র্য ছিল বিস্ময়কর—একদিকে তিনি যেমন চপল কিশোরীর কণ্ঠে গাইতে পারতেন, অন্যদিকে তেমনি গম্ভীর বিরহী সুরকেও প্রাণ দিতে পারতেন।
যুদ্ধের ময়দানে কণ্ঠের লড়াই
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ সাবিনা ইয়াসমিনের জীবনে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। তিনি কেবল ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের কথা ভাবেননি, বরং তার কণ্ঠকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম প্রধান শিল্পী ছিলেন তিনি। তার গাওয়া উদ্বুদ্ধকরণ গানগুলো যুদ্ধের ময়দানে মুক্তিযোদ্ধাদের মানসিক শক্তি জুগিয়েছিল।
তার গাওয়া মুক্তিযুদ্ধের অবিস্মরণীয় কিছু গান:
-
জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো
-
সব কটা জানালা খুলে দাও না
-
মাগো আর তোমারে হারিয়ে যেতে দেব না
-
ও আমার বাংলা মা তোর
এই গানগুলো আজও আমাদের বিজয় দিবসে এবং জাতীয় উৎসবে প্রধান প্রেরণা হিসেবে কাজ করে। দেশাত্মবোধক গানে তার অবদান তাকে ‘দেশের মেয়ে’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
গানের বৈচিত্র্য এবং কালজয়ী সৃষ্টিসমূহ
সাবিনা ইয়াসমিন দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ১২ হাজারেরও বেশি গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। তার গানের ঝুলি এতটাই সমৃদ্ধ যে, সেখান থেকে প্রিয় গান খুঁজে বের করা কঠিন। তবুও কিছু গান বাংলা সঙ্গীতপ্রেমীদের মনে চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছে:
১. চলচ্চিত্রের গান: ‘চিঠি দিও প্রতিদিন’, ‘ও আমার রসিয়া বন্ধু রে’, ‘এই মন তোমাকে দিলাম’, ‘তুমি যে আমার কবিতা’—এমন হাজারো গান চলচ্চিত্রের সোনালী দিনগুলোকে রাঙিয়ে রেখেছে। ২. আধুনিক গান: তার আধুনিক গানগুলো যেমন রুচিশীল তেমনি কাব্যিক। ৩. লোকগীতি ও ক্লাসিক্যাল: পল্লীগীতি বা আধ্যাত্মিক গানেও তিনি তার মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন।
আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, আলাউদ্দিন আলী এবং আলম খানের মতো মহান সুরকারদের সাথে তার জুটি ছিল ঈর্ষণীয়। বিশেষ করে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সুরে তার গাওয়া গানগুলো বাংলা সংগীতে এক নতুন ঘরানা তৈরি করেছিল।
কণ্ঠের জাদুকরী ক্ষমতা ও জনপ্রিয়তা
সাবিনা ইয়াসমিনের গায়কীর প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো তার ‘ক্লারিটি’ বা স্বচ্ছতা। উচ্চগ্রাম বা নিম্নগ্রাম—সবখানেই তার নিয়ন্ত্রণ ছিল নিখুঁত। তার কণ্ঠের মিষ্টতা এবং আবেগ প্রকাশের ধরন তাকে অন্য সব শিল্পীদের থেকে আলাদা করেছে। তিনি কেবল বাংলাদেশে নন, ওপার বাংলাতেও (ভারত) সমান জনপ্রিয়। ভারতের প্রখ্যাত সঙ্গীত পরিচালক আর ডি বর্মন এবং কিশোর কুমারের সাথেও তিনি কাজ করেছেন, যা তার প্রতিভার বিশ্বজনীন স্বীকৃতি।
ব্যক্তি সাবিনা: এক লড়াকু জীবন
সাবিনা ইয়াসমিনের জীবন কেবল সাফল্যের নয়, বরং সংগ্রামেরও। ২০০৭ সালে তিনি মরণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। পুরো দেশ তখন তার সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করেছিল। তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং সবার ভালোবাসায় তিনি ক্যান্সার জয় করে ফিরে আসেন গানের ভুবনে। এই জয় প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল গানের সুরেই নয়, বাস্তব জীবনেও একজন প্রকৃত যোদ্ধা।
স্বীকৃতি ও পুরস্কারের মুকুট
সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় সকল সর্বোচ্চ সম্মাননা। তার প্রাপ্ত উল্লেখযোগ্য পুরস্কারগুলোর মধ্যে রয়েছে:
-
স্বাধীনতা পদক (১৯৯৬): বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান।
-
একুশে পদক (১৯৮৫): শিল্পকলায় বিশেষ অবদানের জন্য।
-
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার: তিনি রেকর্ড ১৩ বার শ্রেষ্ঠ নারী প্লেব্যাক সিঙ্গারের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি বিরল দৃষ্টান্ত।
এছাড়াও বাচসাস পুরস্কার, সিজেএফবি পারফরম্যান্স অ্যাওয়ার্ডসহ অগণিত দেশি-বিদেশি পুরস্কার তার ঝুলিতে রয়েছে।
উত্তরসূরিদের জন্য অনুপ্রেরণা
আজকের প্রজন্মের যারা গান শিখছেন বা গানের জগতে ক্যারিয়ার গড়তে চান, তাদের সবার কাছেই সাবিনা ইয়াসমিন একজন আদর্শ। তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে নিরবচ্ছিন্ন সাধনার মাধ্যমে নিজের কণ্ঠকে ধরে রাখতে হয়। তিনি প্রচারের চেয়ে কাজে বেশি বিশ্বাসী। তার বিনয় এবং শিল্পবোধ তাকে একজন প্রকৃত মানুষের মর্যাদা দিয়েছে।
অম্লান জ্যোতিষ্ক
সাবিনা ইয়াসমিন কেবল একজন কণ্ঠশিল্পী নন, তিনি বাংলাদেশের হৃদস্পন্দন। তার গানগুলো আমাদের সুখের সঙ্গী, দুঃখের সান্ত্বনা এবং যুদ্ধের প্রেরণা। যতদিন বাংলাদেশে বাংলা ভাষা থাকবে, যতদিন এদেশের মানুষ লাল-সবুজের পতাকাকে ভালোবাসবে, ততদিন সাবিনা ইয়াসমিনের সুর আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনিত হবে।
তিনি আজ আমাদের মাঝে আছেন, গান গেয়ে যাচ্ছেন—এটি আমাদের জন্য এক পরম পাওয়া। আমরা চাই তার কণ্ঠের জাদুতে আরও অনেককাল মুখরিত থাকুক আমাদের এই বাংলা ভূমি।
সাবিনা ইয়াসমিন এমন একজন শিল্পী যাকে নিয়ে লিখতে বসলে শব্দ শেষ হবে না, কিন্তু তার গুণের কথা ফুরাবে না। তিনি আমাদের গর্ব, আমাদের অলঙ্কার।


1 Comment