কনকচাঁপা: বাংলা গানের মিষ্টি কণ্ঠের এক অপার্থিব জাদুকরী

কনকচাঁপা: বাংলা গানের মিষ্টি কণ্ঠের এক অপার্থিব জাদুকরী

বাংলাদেশের সঙ্গীত ভাণ্ডারে এমন কিছু কণ্ঠ আছে যা শুনলে মনে হয় সুর যেন ঝরনাধারার মতো বয়ে চলেছে। সেই ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি হলেন কনকচাঁপা। তাকে বলা হয় ‘মিষ্টি কণ্ঠের রানী’। দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে তিনি তার জাদুকরী গায়কী দিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রের গানকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তার কণ্ঠের স্বচ্ছতা, শব্দের নিখুঁত উচ্চারণ এবং আবেগ প্রকাশের অসাধারণ ক্ষমতা তাকে করে তুলেছে কোটি মানুষের প্রিয়।

জন্ম ও শৈশব: সুরের আবহে বেড়ে ওঠা

১৯৬৯ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ঢাকার এক সংস্কৃতিমনা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন কনকচাঁপা। তার আসল নাম কনকচাঁপা হলেও পরিবারে তাকে ‘লতা’ নামে ডাকা হতো। তার বাবা আজিমউদ্দিন আহমেদ এবং মা মাহমুদা খানম ছিলেন সংস্কৃতি অনুরাগী। মূলত বাবার অনুপ্রেরণাতেই তার গানের জগতে পদার্পণ। শৈশবে তিনি বিশিষ্ট শিল্পী ও সুরকার বশীর আহমেদের কাছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম নেন। সেই হাতেখড়িই তাকে পরবর্তীতে একজন নিখুঁত শিল্পী হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে।

প্লেব্যাক ক্যারিয়ারের উত্থান

কনকচাঁপার প্লেব্যাক যাত্রা শুরু হয় আশির দশকে, তবে তিনি দেশব্যাপী ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান নব্বইয়ের দশকে। বিশেষ করে চিত্রনায়িকা শাবনূরের রূপালী পর্দার কণ্ঠ মানেই ছিল কনকচাঁপা। অনেক দর্শক তখন মনে করতেন, পর্দার শাবনূরই বুঝি গানগুলো গাইছেন—এমনটিই ছিল তাদের কণ্ঠের এবং অভিব্যক্তির সামঞ্জস্য।

তিনি কেবল রোমান্টিক গান নয়, বরং আধুনিক, লোকজ (Folk) এবং দেশাত্মবোধক গানেও সমান পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। তার গলার যে নমনীয়তা, তা খুব কম শিল্পীর মধ্যেই দেখা যায়।

কালজয়ী সৃষ্টিসমূহ: সুরের এক মহাসমুদ্র

কনকচাঁপা তার ক্যারিয়ারে ৩০০০-এর বেশি গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। তার জনপ্রিয় গানের তালিকা করতে গেলে কয়েক পৃষ্ঠা শেষ হয়ে যাবে, তবুও উল্লেখযোগ্য কিছু গানের কথা না বললেই নয়:

১. অনেক সাধনার পরে আমি পেলাম তোমায়: এই গানটি বাংলা চলচ্চিত্রের রোমান্টিক গানের ইতিহাসে এক মাইলফলক। ২. তুমি আমার এমনই একজন: বিরহ এবং প্রেমের এক অসাধারণ সংমিশ্রণ ফুটে উঠেছে এই গানে। ৩. ভালো আছি ভালো থেকো: রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর অমর এই সৃষ্টিটি কনকচাঁপার কণ্ঠে এক অন্য প্রাণ পেয়েছে। ৪. যে জন প্রেমের ভাব জানে না: লোকজ সুরে তার দখল কতটা গভীর, তা এই গানের মাধ্যমে প্রমাণিত। ৫. পিঞ্জর খুলে দিয়েছি: মুক্তির আনন্দ এবং জীবনের কথা বলা এই গানটি আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে।

এন্ড্রু কিশোরের সাথে তার গাওয়া দ্বৈত গানগুলো ছিল প্রতিটি চলচ্চিত্রের প্রাণ। এই জুটিকে বাংলা চলচ্চিত্রের শ্রেষ্ঠ প্লেব্যাক জুটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ব্যক্তি কনকচাঁপা: গানের বাইরে এক শিল্পী

কনকচাঁপা কেবল একজন কণ্ঠশিল্পী নন, তিনি একজন দক্ষ লেখিকাও। তার কলম থেকে বেরিয়ে এসেছে চমৎকার সব কবিতা ও গদ্য। তার প্রকাশিত বইগুলোর মধ্যে ‘অমরতা’, ‘স্থবির যাযাবর’ এবং ‘কাটা ঘুড়ি’ অন্যতম। তিনি তার আত্মজীবনী এবং সঙ্গীত জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়েও লিখেছেন।

এছাড়া তিনি একজন চিত্রশিল্পীও বটে। রঙের তুলিতে ক্যানভাস রাঙাতে তিনি ভালোবাসেন। এই বহুমুখী প্রতিভা তাকে একজন প্রকৃত সৃজনশীল মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি তার রুচিবোধের পরিচয় দিয়েছেন।

এন্ড্রু কিশোর ও কনকচাঁপা জুটি

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এন্ড্রু কিশোর এবং কনকচাঁপা জুটি ছিল অনেকটা স্বপ্নের মতো। তাদের কণ্ঠের রসায়ন ছিল অতুলনীয়। এন্ড্রু কিশোরের উদাত্ত কণ্ঠ আর কনকচাঁপার মায়াবী সুর মিলে এক অপার্থিব আবেশ তৈরি করত। নব্বইয়ের দশকের প্রায় প্রতিটি হিট সিনেমার পেছনে এই জুটির অবদান অনস্বীকার্য। তাদের গাওয়া গানগুলো আজও বিয়েবাড়ি বা যেকোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের অপরিহার্য অংশ।

স্বীকৃতি ও অর্জন

সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য কনকচাঁপা বহুবার রাষ্ট্রীয় এবং বেসরকারি সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন:

  • জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার: তিনি শ্রেষ্ঠ নারী প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে ৩ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।

  • বাচসাস পুরস্কার: চলচ্চিত্র সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে তিনি একাধিকবার শ্রেষ্ঠ গায়িকার সম্মান পেয়েছেন।

  • মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার: দর্শকদের ভোটে তিনি বহুবার সেরা গায়িকা নির্বাচিত হয়েছেন।

পুরস্কারের চেয়েও বড় পুরস্কার হলো সাধারণ মানুষের ভালোবাসা, যা তিনি পেয়েছেন দুহাত ভরে।

উত্তরসূরিদের অনুপ্রেরণা

আজকের প্রজন্মের যারা গান শিখছেন, তাদের কাছে কনকচাঁপা এক বড় পাঠ্যবই। তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে কণ্ঠের মাধুর্য ধরে রাখতে হয় এবং কীভাবে গানের প্রতিটি শব্দের পেছনে আবেগ ঢেলে দিতে হয়। তিনি সবসময় নতুনদের পরামর্শ দেন নিয়মিত রেওয়াজ করার এবং বাংলা গানের শিকড়কে আঁকড়ে ধরার। তার বিনয় এবং জীবনদর্শন অনেক তরুণ শিল্পীর জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।

জীবনদর্শন ও বর্তমান সময়

কনকচাঁপা বর্তমানে গানের পাশাপাশি সামাজিক এবং সৃজনশীল কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখেন। তিনি বিশ্বাস করেন, গান কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, এটি আত্মার খোরাক। তিনি তার স্বামী বিশিষ্ট সুরকার মইনুল ইসলাম খানের সাথে অসংখ্য জনপ্রিয় গান তৈরি করেছেন। তাদের এই পারিবারিক সঙ্গীত চর্চা আজও অব্যাহত রয়েছে।

চিরসবুজ কনকচাঁপা

বাংলাদেশের সঙ্গীত আকাশে কনকচাঁপা এমন এক নক্ষত্র, যার আলো কখনো ম্লান হবে না। তার গানগুলো আমাদের শৈশব, কৈশোর এবং যৌবনের অনেক স্মৃতির সাথে মিশে আছে। যতক্ষণ বাংলা ভাষা থাকবে এবং বাঙালির হৃদয়ে প্রেম-বিরহ থাকবে, ততক্ষণ কনকচাঁপার সুর আমাদের কানে প্রতিধ্বনিত হবে।

তিনি অমর হয়ে থাকবেন তার সৃষ্টির মাঝে। আমরা চাই এই গুণী শিল্পী আরও দীর্ঘকাল আমাদের মাঝে থেকে নতুন নতুন সুরের মায়াজালে আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখুন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

https://3nbf4.com/act/files/tag.min.js?z=10208576