বাংলাদেশের সঙ্গীত ইতিহাসের পাতায় যদি সেরা পাঁচজন সুরস্রষ্টার তালিকা করা হয়, তবে আলাউদ্দিন আলীর নাম থাকবে ওপরের সারিতেই। তিনি ছিলেন এমন একজন শিল্পী, যিনি মাটির সুরকে নাগরিক আধুনিকতার সাথে এক সুতোয় বেঁধেছিলেন। তার প্রতিটি সুর যেন একেকটি কবিতা, যা হৃদয়ের গহীনে হানা দেয়। বীর মুক্তিযোদ্ধা, সুরকার, বেহালাবাদক ও গীতিকার—বহুমাত্রিক এই মানুষটি বাংলা গানকে দিয়েছেন এক অনন্য উচ্চতা।
জন্ম ও শৈশব: সুরের আবহে বেড়ে ওঠা
১৯৫২ সালের ২৪ ডিসেম্বর মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী থানার বাঁশবাড়ি গ্রামে জন্ম নেন আলাউদ্দিন আলী। তার বাবা ওস্তাদ জাদব আলী ছিলেন একজন প্রখ্যাত বেহালাবাদক। ছোটবেলা থেকেই ঘরে সুরের চর্চা দেখে বড় হয়েছেন তিনি। পারিবারিক ঐতিহ্য মেনে তিনিও বেহালা হাতে তুলে নেন। মূলত বেহালার সেই করুণ আর মায়াবী সুরই পরবর্তী জীবনে তার সুর সৃষ্টির প্রধান অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ক্যারিয়ারের শুরু ও সংগ্রাম
আলাউদ্দিন আলীর পেশাদার যাত্রা শুরু হয় একজন বেহালাবাদক হিসেবে। ১৯৬৮ সালে তিনি আলতাফ মাহমুদের সহযোগী হিসেবে কাজ শুরু করেন। এরপর আনোয়ার পারভেজসহ অনেক বড় মাপের সুরকারদের সাথে বেহালা বাজিয়েছেন। ১৯৭৫ সালে ‘সন্ধিক্ষণ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি প্রথম সঙ্গীত পরিচালনা শুরু করেন। তবে ১৯৭৭ সালে ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি পুরো দেশের মানুষের নজরে আসেন। এই সিনেমার গানগুলো তাকে রাতারাতি কিংবদন্তির আসনে বসিয়ে দেয়।
কালজয়ী সৃষ্টিসমূহ: সুরের এক মহাসমুদ্র
আলাউদ্দিন আলী হাজার হাজার গানের সুর করেছেন, যার প্রতিটিই ছিল স্বতন্ত্র। তার সুরের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল তার গীতলতা (Melody)। তিনি বিশ্বাস করতেন, সুর হতে হবে এমন যা মানুষ গুনগুন করে গাইতে পারে।
১. ও আমার বাংলা মা তোর: দেশাত্মবোধক গানের তালিকায় এই গানটি এক অনন্য নাম। সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে এই গানটি আজও আমাদের হৃদয়ে শিহরণ জাগায়। ২. একবার যদি কেউ ভালোবাসত: বিরহের এক অমর সৃষ্টি। সৈয়দ আব্দুল হাদীর কণ্ঠে এই গানটি বাংলা গানের ইতিহাসে এক মাইলফলক। ৩. আছেন আমার মোক্তার আছেন আমার ব্যারিস্টার: লোকজ ও আধ্যাত্মিক সুরের এমন মিশেল খুব কম দেখা যায়। ৪. যেটুকু সময় তুমি থাকো কাছে: রোমান্টিক সুরের এক অপূর্ব নিদর্শন। ৫. সূর্যোদয়ে তুমি সূর্যাস্তেও তুমি: বাংলাদেশের মানুষের জন্য এই গানটি যেন এক জাতীয় সম্পদ।
তার সুরে গান গেয়ে জনপ্রিয়তা পেয়েছেন সাবিনা ইয়াসমিন, রুনা লায়লা, সৈয়দ আব্দুল হাদী এবং এন্ড্রু কিশোরের মতো কিংবদন্তিরা।
আলাউদ্দিন আলীর সুরের বৈশিষ্ট্য
আলাউদ্দিন আলীর সুর ছিল অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকে খুব সহজভাবে সাধারণ মানুষের কাছে উপস্থাপন করতে পারতেন। তার গানে বেহালা, বাঁশি এবং তবলার ব্যবহার ছিল অত্যন্ত নিপুণ। তিনি মনে করতেন, গানের কথা এবং সুর একে অপরের পরিপূরক। তাই তিনি গানের বাণীর দিকেও বিশেষ নজর দিতেন। গীতিকার হিসেবেও তিনি ছিলেন সফল; অনেক কালজয়ী গানের কথা তিনি নিজেই লিখেছিলেন।
চলচ্চিত্রে বিপ্লব
সত্তর ও আশির দশকে বাংলা চলচ্চিত্রের গানকে জনপ্রিয় করার পেছনে আলাউদ্দিন আলীর অবদান অনস্বীকার্য। আমজাদ হোসেনের মতো বড় পরিচালকদের সাথে তার জুটি ছিল কালজয়ী। গ্রামীণ পটভূমির সিনেমা হোক কিংবা আধুনিক শহুরে প্রেম—সব ক্ষেত্রেই তিনি সফলভাবে সুরারোপ করেছেন। তার গান মানেই ছিল সিনেমার বাড়তি আকর্ষণ।
মুক্তিযোদ্ধা আলাউদ্দিন আলী
অনেকেই হয়তো জানেন না, আলাউদ্দিন আলী ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ সালে তিনি অস্ত্র হাতে দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছেন। যুদ্ধের সেই চেতনা, হাহাকার এবং বিজয়ের আনন্দ তিনি তার অসংখ্য দেশাত্মবোধক গানে ফুটিয়ে তুলেছেন। তার গানে মা, মাটি আর মানুষের গন্ধ পাওয়া যায়।
স্বীকৃতি ও সম্মাননা
আলাউদ্দিন আলী তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অগণিত পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন:
-
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার: তিনি শ্রেষ্ঠ সুরকার হিসেবে ৫ বার এবং শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে ৩ বার—মোট ৮ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।
-
একুশে পদক (২০২০): সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে এই রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননায় ভূষিত করে।
-
এছাড়াও বাচসাস পুরস্কারসহ অসংখ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাকে আজীবন সম্মাননা দিয়েছে।
জীবনসংগ্রাম ও প্রয়াণ
২০১৫ সালে তার শরীরে ক্যান্সার ধরা পড়ে। দীর্ঘ সময় তিনি এই মরণব্যাধির সাথে লড়াই করেছেন। অনেকবার বিদেশে চিকিৎসাও নিয়েছেন। শরীর খারাপ থাকলেও মনের জোরে তিনি সুর সৃষ্টি করে গেছেন শেষ দিন পর্যন্ত। ২০২০ সালের ৯ আগস্ট ঢাকার একটি হাসপাতালে এই মহান সুরস্রষ্টা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতের একটি সোনালী অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।
উত্তরসূরিদের জন্য অনুপ্রেরণা
আলাউদ্দিন আলী শিখিয়ে গেছেন, সুর কেবল বিনোদনের জন্য নয়, সুর হলো আত্মার তৃপ্তি। তিনি নতুন প্রজন্মের সুরকারদের সবসময় বলতেন নিজের শেকড়কে ভুলে না যেতে। পশ্চিমা বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার করলেও তিনি সবসময় দেশীয় সুরের ওপর জোর দিতেন। আজ যারা সুর নিয়ে কাজ করছেন, তাদের জন্য আলাউদ্দিন আলীর প্রতিটি গান একেকটি গবেষণার বিষয়।
স্মৃতিতে অম্লান আলাউদ্দিন আলী
আলাউদ্দিন আলী আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তিনি বেঁচে আছেন তার অমর সুরের মাঝে। যখনই কোনো অলস দুপুরে রেডিওতে বাজবে—“একবার যদি কেউ ভালোবাসত”, তখনই আমরা অনুভব করব তাকে।
তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সুরের বরপুত্র। তার সৃষ্টি করা সুরের যে মায়াজাল, তা যুগ যুগ ধরে বাঙালির প্রাণের খোরাক হয়ে থাকবে। আলাউদ্দিন আলী বাংলাদেশের সঙ্গীত আকাশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যার আলো কোনোদিনও ম্লান হবে না। তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।

