আলমগীর: বাংলা চলচ্চিত্রের চিরসবুজ রাজপুত্র ও অভিনয়ের মহীরুহ

আলমগীর: বাংলা চলচ্চিত্রের চিরসবুজ রাজপুত্র ও অভিনয়ের মহীরুহ

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সোনালী অধ্যায়ের কথা বললে যে কজন নায়কের চেহারা আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তাদের মধ্যে আলমগীর অন্যতম। সুঠাম দেহ, দরাজ কণ্ঠ আর সাবলীল অভিনয়—এই তিনের সমন্বয়ে তিনি দশকের পর দশক ধরে শাসন করেছেন রূপালী পর্দা। রোমান্টিক নায়ক থেকে শুরু করে অ্যাকশন, কিংবা পারিবারিক ড্রামায় বড় ভাই বা বাবার চরিত্র—সবখানেই তিনি নিজেকে প্রমাণ করেছেন অনন্য হিসেবে। তিনি কেবল একজন অভিনেতা নন, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল।

জন্ম ও শৈশব

আলমগীর ১৯৫০ সালের ৩ এপ্রিল ঢাকার ইডেন কলেজ সংলগ্ন এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম খন্দকার মাহবুব আলমগীর। তার বাবা কলিম উদ্দিন আহমেদ ছিলেন ঢালিউডের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এর একজন প্রযোজক। ফলে পারিবারিক সূত্রেই চলচ্চিত্রের সাথে তার নাড়ির টান ছিল। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন সংস্কৃতিমনা, যা তাকে পরবর্তীতে অভিনয়ের বিশাল আঙিনায় টেনে আনে।

চলচ্চিত্রে পদার্পণ ও প্রথম সাফল্য

আলমগীরের চলচ্চিত্র যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৩ সালে আলমগীর কুমকুম পরিচালিত ‘আমার জন্মভূমি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। প্রথম ছবিতেই তিনি নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। তবে তার ক্যারিয়ারে বড় ধরনের মোড় আসে আশির দশকের শুরুতে। সেই সময়ে তিনি রোমান্টিক নায়ক হিসেবে দারুণ জনপ্রিয়তা পান। বিশেষ করে শাবানা এবং ববিতার সাথে তার জুটি ছিল দর্শকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়।

শাবানা-আলমগীর জুটি: এক অবিস্মরণীয় রসায়ন

ঢালিউডের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল ও জনপ্রিয় জুটিগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো আলমগীর ও শাবানা। তারা একসাথে ১২০টিরও বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছেন, যা বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি বিরল রেকর্ড। ‘ভাত দে’, ‘অপেক্ষা’, ‘মরণের পরে’, ‘মায়ের দোয়া’, ‘অন্ধ বিশ্বাস’-এর মতো অসংখ্য ব্যবসা সফল এবং প্রশংসিত সিনেমা তারা উপহার দিয়েছেন। গ্রামীণ বধূ আর আদর্শ স্বামীর চরিত্রে এই জুটিকে মানুষ আপন করে নিয়েছিল।

অভিনয়ের বৈচিত্র্য ও শ্রেষ্ঠত্ব

আলমগীরের অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার বহুমুখিতা। তিনি নিজেকে কেবল রোমান্টিক ইমেজে বন্দি করে রাখেননি।

  • পারিবারিক ড্রামা: পারিবারিক সিনেমায় একজন দায়িত্বশীল বড় ভাই বা আদর্শ ছেলের চরিত্রে তার অভিনয় ছিল নিখুঁত।

  • অ্যাকশন ও প্রতিবাদী চরিত্র: সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী যুবকের চরিত্রেও তিনি ছিলেন সমান সাবলীল।

  • চরিত্রাভিনেতা: ক্যারিয়ারের উত্তরসূরি হিসেবে তিনি যখন বাবার চরিত্রে অভিনয় শুরু করেন, সেখানেও তিনি নিজের রাজত্ব বজায় রেখেছেন।

তার দরাজ কণ্ঠস্বর এবং সংলাপ প্রক্ষেপণ শৈলী তাকে অন্য অনেক অভিনেতার চেয়ে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে।

পরিচালক ও প্রযোজক হিসেবে আলমগীর

অভিনয়ের পাশাপাশি আলমগীর চলচ্চিত্র নির্মাণেও মেধার পরিচয় দিয়েছেন। ১৯৮৫ সালে ‘নিষ্পাপ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তার পরিচালিত ও প্রযোজিত সিনেমাগুলো সাধারণত সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হতো। তার পরিচালিত উল্লেখযোগ্য সিনেমার মধ্যে রয়েছে ‘নির্মম’, ‘বৌমা’, ‘মায়ের দোয়া’ এবং সবশেষ ‘একটি সিনেমার গল্প’। চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়ে তার গভীর জ্ঞান তাকে একজন সফল নির্মাতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

পুরস্কার ও রেকর্ড বুক

আলমগীর বাংলাদেশের একমাত্র অভিনেতা যিনি রেকর্ড ৯ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেছেন। তার এই অর্জন তার নিরবচ্ছিন্ন সাধনা ও অভিনয়ের প্রতি নিষ্ঠারই প্রমাণ।

  • ১৯৭৭ সালে ‘মা’ চলচ্চিত্রের জন্য প্রথম জাতীয় পুরস্কার পান।

  • এরপর ‘ভাত দে’, ‘অপেক্ষা’, ‘ক্ষতিপূরণ’, ‘মরণের পরে’, ‘পিতা মাতা সন্তান’ এবং ‘অন্ধ বিশ্বাস’-এর মতো ছবির জন্য তিনি এই সম্মাননা পান।

  • ২০১৯ সালে তাকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয়।

ব্যক্তি জীবন ও সংগীতের সাথে সখ্যতা

আলমগীরের ব্যক্তিগত জীবনও বেশ আলোচিত। তার প্রথম স্ত্রী ছিলেন খোশনুর আলমগীর। পরবর্তীতে তিনি উপমহাদেশের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লা-র সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। সঙ্গীত এবং অভিনয়ের এই মিলন দুই বাংলার মানুষের কাছেই এক সুন্দর দৃষ্টান্ত। আলমগীরের কন্যা আঁখি আলমগীরও দেশের একজন প্রতিষ্ঠিত এবং জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী। সব মিলিয়ে এক বিশাল সাংস্কৃতিক আবহ রয়েছে তার পরিবারে।

চলচ্চিত্রের প্রতি ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা

আলমগীর সবসময় চলচ্চিত্রের মানোন্নয়ন নিয়ে সোচ্চার ছিলেন। তিনি মনে করেন, ভালো গল্প আর পরিচ্ছন্ন নির্মাণই পারে দর্শকদের প্রেক্ষাগৃহে ফিরিয়ে আনতে। বর্তমানে চলচ্চিত্রের সংকটের সময়েও তিনি সবসময় নবীনদের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন এবং চলচ্চিত্রের উন্নয়নে বিভিন্ন সংগঠনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার ব্যক্তিত্ব এবং গাম্ভীর্য জুনিয়র শিল্পীদের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা।

উত্তরসূরিদের জন্য শিক্ষা

আজকের প্রজন্মের যারা অভিনয়ে আসতে চান, তাদের জন্য আলমগীর এক পূর্ণাঙ্গ পাঠ্যবই। কীভাবে একটি চরিত্রকে নিজের ভেতর ধারণ করতে হয়, কীভাবে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে ব্যক্তিত্ব বজায় রাখতে হয়—তা আলমগীরের অভিনয় দেখলে বোঝা যায়। তার নিয়মানুবর্তিতা এবং পেশাদারিত্ব তাকে আজ কিংবদন্তির আসনে বসিয়েছে।

চিরসবুজ আলমগীর

বয়স বাড়লেও আলমগীরের জনপ্রিয়তা কমেনি এতটুকু। তিনি আজও আমাদের চলচ্চিত্রের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। যখনই কোনো টেলিভিশন চ্যানেলে ‘ভাত দে’ বা ‘পিতা মাতা সন্তান’ প্রদর্শিত হয়, আজও মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার অভিনয় দেখে।

তিনি কেবল একজন অভিনেতা নন, তিনি একাধারে একজন আদর্শ মানুষ এবং চলচ্চিত্রের অভিভাবক। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আলমগীরের নাম চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আমরা তার দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্য কামনা করি, যেন তিনি আরও অনেক বছর আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে আলোকিত করে রাখতে পারেন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

https://3nbf4.com/act/files/tag.min.js?z=10208576