জহির রায়হান: সেলুলয়েডের কবি ও এক অপরাজিত স্বপ্নের নায়ক

জহির রায়হান: সেলুলয়েডের কবি ও এক অপরাজিত স্বপ্নের নায়ক

বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাসে জহির রায়হান একটি মহাকাব্যের নাম। তিনি এমন একজন মানুষ ছিলেন, যার এক হাতে ছিল ক্যামেরা আর অন্য হাতে ছিল কলম। তিনি আমাদের শিখিয়েছিলেন কীভাবে ছবির মাধ্যমে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে হয় এবং শব্দের মাধ্যমে বিপ্লব ঘটাতে হয়। জহির রায়হান মানেই এক অদম্য সাহস, যিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন এবং সেই স্বপ্নের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

জন্ম ও সংগ্রামী শৈশব

১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট বর্তমান ফেনী জেলার মজুপুর গ্রামে জহির রায়হান জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম ছিল মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী এবং সমাজ সচেতন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং কারাবরণ করেন। সেই আন্দোলনের চেতনা তার সারা জীবনের কর্মে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

বাংলা সাহিত্যে জহির রায়হান

চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে বিশ্বখ্যাত হলেও জহির রায়হান মূলত একজন শক্তিশালী সাহিত্যিক ছিলেন। তার লেখা উপন্যাসগুলো বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।

  • হাজার বছর ধরে: গ্রামীণ জনজীবনের কুসংস্কার, প্রেম এবং শাশ্বত রূপ এই উপন্যাসে অসাধারণভাবে ফুটে উঠেছে।

  • আরেক ফালগুন: ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে লেখা এই উপন্যাসটি প্রতিটি বাঙালির জন্য এক ঐতিহাসিক দলিল।

  • বরফ গলা নদী: মধ্যবিত্ত সমাজের টানাপড়েন এবং জীবনের রূঢ় বাস্তবতা এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য।

চলচ্চিত্রের জাদুকর ও পথপ্রদর্শক

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে বিশ্ব দরবারে পরিচিত করার ক্ষেত্রে জহির রায়হানের অবদান অতুলনীয়। তিনি প্রতিটি ছবিতে নতুন কিছু করার চেষ্টা করতেন।

  • জীবন থেকে নেয়া (১৯৭০): এটি কেবল একটি সিনেমা ছিল না, এটি ছিল একটি রাজনৈতিক বিপ্লব। একটি পরিবারের ভেতর দিয়ে তিনি তৎকালীন পাকিস্তানের শাসন-শোষণ এবং মুক্তিপাগল মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। এই ছবিতে প্রথমবারের মতো ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি ব্যবহৃত হয়।

  • কাঁচের দেয়াল (১৯৬৩): এটি ছিল একটি শৈল্পিক চলচ্চিত্র, যা বোদ্ধা মহলে দারুণ প্রশংসিত হয়।

  • সংগম (১৯৬৪): পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র নির্মাণ করে তিনি কারিগরি দক্ষতায় নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন।

  • বাহানা (১৯৬৫): এটি ছিল পাকিস্তানের প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র।

১৯৭১ ও ‘স্টপ জেনোসাইড’: এক অমর প্রামাণ্যচিত্র

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে জহির রায়হানের ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে তিনি নির্মাণ করেন প্রামাণ্যচিত্র ‘স্টপ জেনোসাইড’ (Stop Genocide)। মাত্র ২০ মিনিটের এই ছবিটি বিশ্ববিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। যুদ্ধের সময় তিনি কলকাতায় থেকে প্রবাসী সরকারের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নেতৃত্ব দেন।

এক বিদ্রোহী সত্তার কণ্ঠস্বর

জহির রায়হান বিশ্বাস করতেন, শিল্প কেবল বিনোদনের জন্য নয়, তা শোষিতের কণ্ঠস্বর হওয়া উচিত। তার ‘জীবন থেকে নেয়া’ ছবিতে তিনি রূপকের আশ্রয়ে স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের পতনের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। সিনেমার প্রতিটি সংলাপ এবং দৃশ্য ছিল এক একটি অগ্নিস্ফুলিঙ্গ। তার অসীম সাহসের কারণেই সেন্সর বোর্ডের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সেই সময় ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল।

ব্যক্তিগত জীবন ও বিয়োগান্তক অন্তর্ধান

ব্যক্তি জীবনে জহির রায়হান ছিলেন অত্যন্ত আবেগপ্রবণ এবং শিল্পমনা। তিনি দুবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন—প্রথমে অভিনেত্রী সুমিতা দেবী এবং পরে অভিনেত্রী শবনম (পরে কোহিনূর আক্তার সুচন্দা)।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলেও জহির রায়হানের মুখে হাসি ছিল না। তার বড় ভাই প্রখ্যাত সাহিত্যিক শহীদুল্লাহ কায়সার পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর আলবদরদের হাতে অপহৃত হন। ভাইকে খুঁজতে গিয়ে ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি মিরপুর এলাকায় তিনি নিখোঁজ হন। আজ পর্যন্ত তার কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। বাংলার এই সূর্যসন্তান কোথায় হারিয়ে গেলেন, তা আজও এক রহস্য হয়ে আছে।

স্বীকৃতি ও অর্জন

তার অসামান্য অবদানের জন্য তিনি মরণোত্তর বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন:

  • একুশে পদক (১৯৭৭)

  • স্বাধীনতা পদক (১৯৯২)

  • বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৭২)

  • জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার

কিন্তু তার সবচেয়ে বড় অর্জন হলো কোটি কোটি বাঙালির ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা।

উত্তরসূরিদের জন্য শিক্ষা

জহির রায়হান শিখিয়ে গেছেন, শিল্পীর দায়বদ্ধতা কেবল নিজের কাছে নয়, নিজের দেশ ও জাতির কাছে। তিনি আজ নেই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া ‘আরেক ফালগুন’ কিংবা ‘জীবন থেকে নেয়া’ আজও আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে প্রেরণা দেয়। বর্তমান প্রজন্মের নির্মাতাদের জন্য তিনি এক ধ্রুবতারা।

অমর জহির রায়হান

জহির রায়হান এমন একজন মানুষ যিনি খুব অল্প সময়ের জন্য পৃথিবীতে এসেছিলেন, কিন্তু যা রেখে গেছেন তা কয়েক শতাব্দী ধরে বাঙালির হৃদয়ে অনুরণিত হবে। তিনি ছিলেন আমাদের মুক্তির গানের প্রথম গায়ক। তিনি মারা যাননি; তিনি বেঁচে আছেন প্রতিটি একুশে ফেব্রুয়ারিতে, প্রতিটি বিজয়ের আনন্দে এবং প্রতিটি সংগ্রামী মিছিলে।

জহির রায়হানকে ছাড়া বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও সাহিত্যের ইতিহাস অসম্পূর্ণ। তার আদর্শ ও চেতনাকে লালন করাই হবে তার প্রতি আমাদের প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

https://3nbf4.com/act/files/tag.min.js?z=10208576