ওস্তাদ হাবিব উদ্দিন খাঁ: উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের এক অমর সাধক ও সুরের কারিগর

ওস্তাদ হাবিব উদ্দিন খাঁ: উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের এক অমর সাধক ও সুরের কারিগর

উপমহাদেশের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে যারা প্রচারের আলোর চেয়ে সাধনার গভীরতাকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। ওস্তাদ হাবিব উদ্দিন খাঁ ছিলেন সেই বিরল প্রতিভাদের একজন। তিনি কেবল একজন দক্ষ কণ্ঠশিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সুরস্রষ্টা এবং অসাধারণ এক শিক্ষক। তার কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেই রুনা লায়লার মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পীরা নিজেদের কণ্ঠকে বিশ্বদরবারে পৌঁছে দিয়েছেন।

জন্ম ও পারিবারিক ঐতিহ্য

ওস্তাদ হাবিব উদ্দিন খাঁ বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে এক ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পারিবারিক পটভূমি ছিল সুর আর তালের মেলবন্ধনে গড়া। ছোটবেলা থেকেই তিনি ঘরোয়া পরিবেশে সঙ্গীতের তালিম পেতে থাকেন। তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের সঙ্গীত রাজধানী হিসেবে পরিচিত অঞ্চলগুলোতে তার বিচরণ ছিল। সঙ্গীত ছিল তার কাছে কেবল পেশা নয়, বরং এক পরম আরাধনা।

সঙ্গীত শিক্ষা ও ঘরানা

তিনি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ঐতিহ্যবাহী ‘কাসুর পাতিয়ালা’ ঘরানার ধারক ছিলেন বলে জানা যায়। তার গায়কীতে ছিল ধ্রুপদ, খেয়াল ও ঠুমরির এক অসাধারণ সংমিশ্রণ। তিনি অত্যন্ত কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে দিয়ে নিজের কণ্ঠকে তৈরি করেছিলেন। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের সূক্ষ্ম কাজগুলো তিনি যেভাবে অবলীলায় উপস্থাপন করতেন, তা সমসাময়িক পণ্ডিত ও ওস্তাদদের কাছে ছিল বিস্ময়ের বিষয়।

শিক্ষক হিসেবে অনন্য অবদান

ওস্তাদ হাবিব উদ্দিন খাঁ-র জীবনের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো তার শিক্ষাদান পদ্ধতি। তিনি ছিলেন একজন জহুরী, যিনি হীরা চিনে নিতে ভুল করতেন না।

  • রুনা লায়লার গুরু: রুনা লায়লা যখন করাচিতে থাকতেন, তখন তার বাবার বিশেষ অনুরোধে ওস্তাদ হাবিব উদ্দিন খাঁ তাকে গান শেখানো শুরু করেন। রুনা লায়লা নিজেই বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে কৃতজ্ঞচিত্তে স্বীকার করেছেন যে, তার কণ্ঠের ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিলেন এই ওস্তাদজি। তিনি বলতেন, “ওস্তাদজি আমার গলার ভেতরে যেন সুরের এক বিশাল ভাণ্ডার খুলে দিয়েছিলেন।”

  • কঠোর নিয়মাবলি: তিনি তার ছাত্রছাত্রীদের ভোরের আলো ফোটার আগে রেওয়াজে বসাতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, ভোরের শুদ্ধ বাতাসে সুরের যে সাধনা হয়, তা আর অন্য কোনো সময়ে সম্ভব নয়। তার শেখানোর ধরণ ছিল খুব মমতাময়ী কিন্তু শৃঙ্খলার প্রশ্নে ছিলেন আপসহীন।

গায়কী ও কণ্ঠের বৈশিষ্ট্য

ওস্তাদ হাবিব উদ্দিন খাঁ-র কণ্ঠ ছিল অত্যন্ত গম্ভীর এবং মার্জিত। তিনি যখন খেয়াল গাইতেন, তখন সুরের আলাপ ও তানগুলো এক মোহনীয় আবেশ তৈরি করত। তার কণ্ঠের মডুলেশন বা স্বরগ্রামের ওঠানামা ছিল অত্যন্ত নিখুঁত। বিশেষ করে বিলম্বিত লয় থেকে দ্রুত লয়ে যাওয়ার দক্ষতা তাকে অন্যান্য উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিল্পীদের থেকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছিল।

করাচি থেকে ঢাকা: সুরের সফর

দেশভাগের পর এবং পরবর্তী সময়ে তিনি করাচিতে দীর্ঘদিন অবস্থান করেন। সেখানেই তার সাথে রুনা লায়লার পরিবারের পরিচয় হয়। তিনি সেই সময়ের রেডিও পাকিস্তান এবং করাচি টেলিভিশনের অত্যন্ত সম্মানিত একজন শিল্পী ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশেও তার সঙ্গীতের প্রভাব রেখে গেছেন। পূর্ব ও পশ্চিম—উভয় বাংলার উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত চর্চায় তার পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা ছিল অত্যন্ত মূল্যবান।

প্রচারবিমুখ এক সাধু জীবন

ওস্তাদ হাবিব উদ্দিন খাঁ কোনোদিন সস্তা জনপ্রিয়তা বা অর্থের পেছনে ছোটেননি। তিনি মনে করতেন, সঙ্গীত হলো সৃষ্টিকর্তার ইবাদতের মতো। তিনি নিভৃতে থেকে ছাত্রদের তৈরি করা এবং নিজের সুর সাধনা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতেন। তার এই ত্যাগের কারণেই আজ তার ছাত্রছাত্রীরা বিশ্বজয় করেছেন। তিনি সবসময় বলতেন, “একজন শিল্পীর আসল পরিচয় তার সুরে, তার প্রচারণায় নয়।”

রাগ-রাগিণীর ওপর দখল

ওস্তাদজি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের প্রতিটি রাগের তত্ত্ব ও প্রয়োগ নিয়ে গভীর জ্ঞান রাখতেন। বিশেষ করে ভৈরব, ইমন, দরবারি কানাড়া এবং মালকোষ রাগে তার দখল ছিল কিংবদন্তিতুল্য। তিনি প্রতিটি রাগের ভাব বা মেজাজকে এমনভাবে ফুটিয়ে তুলতেন যে শ্রোতারা সেই সুরের গভীরে ডুবে যেতেন। তার সুরে এক ধরণের আধ্যাত্মিক আবহ থাকত যা মানুষের আত্মাকে শান্তি দিত।

উত্তরসূরিদের জন্য অনুপ্রেরণা

আজকের যুগে যখন উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত চর্চা কিছুটা সীমিত হয়ে আসছে, তখন ওস্তাদ হাবিব উদ্দিন খাঁ-র জীবন ও কর্ম আমাদের নতুন করে প্রেরণা দেয়। তিনি শিখিয়েছেন যে, ভিত্তি শক্ত না হলে সঙ্গীতের বিশাল ইমারত গড়া সম্ভব নয়। রুনা লায়লার মতো বড় মাপের শিল্পীর গড়ে ওঠার পেছনে তার যে ভূমিকা, তা থেকেই বোঝা যায় একজন ওস্তাদের গুরুত্ব কতটুকু।

স্মৃতি ও মূল্যায়ন

দুর্ভাগ্যবশত, ওস্তাদ হাবিব উদ্দিন খাঁ-র মতো গুণী শিল্পীদের নিয়ে বর্তমান প্রজন্মের কাছে তথ্যের খুব অভাব। তার গাওয়া অনেক বিরল রাগ বা গানের রেকর্ডিং যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে। সঙ্গীত গবেষকদের মতে, ওস্তাদজির মতো সাধকদের কর্মশালা এবং তাদের শেখানো পদ্ধতিগুলো নথিবদ্ধ করা অত্যন্ত জরুরি।

শেষ কথা

ওস্তাদ হাবিব উদ্দিন খাঁ ছিলেন সুরের আকাশের এক ধ্রুবতারা। তিনি সশরীরে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার কণ্ঠের মডুলেশন আর সুরের শিক্ষা বেঁচে আছে তার যোগ্য শিষ্যদের মাঝে। রুনা লায়লা যখন মঞ্চে গান ধরেন, তখন যেন নেপথ্যে ওস্তাদ হাবিব উদ্দিন খাঁ-র সেই কঠোর পরিশ্রম আর আশীর্বাদই অনুরণিত হয়।

উপমহাদেশের উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ইতিহাসে তার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তিনি কেবল একজন শিক্ষক নন, তিনি ছিলেন সুরের এক আলোকবর্তিকা।

ওস্তাদ হাবিব উদ্দিন খাঁ-র প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর শ্রেষ্ঠ উপায় হলো তার আদর্শ মেনে সঙ্গীতের শুদ্ধ চর্চা বজায় রাখা। তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

https://3nbf4.com/act/files/tag.min.js?z=10208576