আলম খান: সুরের কারিগর ও ঢাকাই সিনেমার গানের কিংবদন্তি

আলম খান: সুরের কারিগর ও ঢাকাই সিনেমার গানের কিংবদন্তি

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গানের কথা উঠলেই যে মানুষটির নাম সবার আগে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে উচ্চারিত হয়, তিনি হলেন আলম খান। তিনি ছিলেন এমন একজন জাদুকরী সুরকার, যিনি মাটির গানকে আধুনিক বিশ্বের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। তার সুর করা হাজার হাজার গান কয়েক প্রজন্ম ধরে বাঙালির মুখে মুখে ফিরছে। তিনি কেবল একজন সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন না, তিনি ছিলেন বাংলা চলচ্চিত্রের গানের আধুনিক রূপকার।

জন্ম ও শৈশব: সুরের আবহে পদার্পণ

আলম খান ১৯৪৪ সালের ২২ অক্টোবর সিরাজগঞ্জের বানিয়াগাতি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম খুরশিদ আলম খান। তার বাবা এ এস খান ছিলেন একজন সরকারি কর্মকর্তা এবং মা জোবেদা খানম ছিলেন গৃহিণী। ছোটবেলা থেকেই তার মধ্যে সুরের প্রতি এক সহজাত টান ছিল। ১৯৫৬ সালে তিনি যখন ঢাকায় চলে আসেন, তখন থেকেই তার সঙ্গীত চর্চা আরও গভীর হয়। ওস্তাদ ননী চ্যাটার্জি এবং ওস্তাদ সাগীরউদ্দীন খাঁ-র কাছে তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের তালিম নেন।

ক্যারিয়ারের শুরু: এক নতুন দিগন্তের সূচনা

১৯৭০ সালে ‘কাঁচ কাটা হীরে’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আলম খান সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে যাত্রা শুরু করেন। তবে তিনি দেশব্যাপী ব্যাপক জনপ্রিয়তা এবং নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করেন ১৯৭৮ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘অশিক্ষিত’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। এই সিনেমার গানগুলো তাকে খ্যাতির চূড়ায় নিয়ে যায়। এরপর টানা চার দশক তিনি ঢাকাই চলচ্চিত্রের অঘোষিত সম্রাট হিসেবে কাজ করেছেন।

কালজয়ী সৃষ্টিসমূহ: সুরের এক মহাসমুদ্র

আলম খানের সুর মানেই ছিল ভিন্ন কিছু। তিনি বাদ্যযন্ত্রের এমন অভিনব ব্যবহার করতেন যা সেই সময়ে কল্পনা করাও কঠিন ছিল। তার জনপ্রিয় কিছু কালজয়ী গানের কথা নিচে দেওয়া হলো:

১. ওরে নীল দরিয়া: ১৯৭৮ সালের ‘সারেং বৌ’ চলচ্চিত্রের এই গানটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অন্যতম সেরা সৃষ্টি। বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জব্বারের কণ্ঠে এই গানটি আজও প্রতিটি বাঙালির রক্তে নাচন সৃষ্টি করে। ২. হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস: এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠে জীবনের নশ্বরতা নিয়ে লেখা এই গানটি আলম খানের ক্যারিয়ারের অন্যতম মাইলফলক। ৩. ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে: আধ্যাত্মিক চেতনার এই গানটি বাংলাদেশের মানুষের আত্মায় মিশে আছে। ৪. সবাই তো ভালোবাসা চায়: প্রেমের চিরন্তন আকুতি আর আধুনিক সুরের এক অপূর্ব মিশেল এই গানে পাওয়া যায়। ৫. চুমকি চলেছে একা পথে: চপল সুর আর আনন্দের এক মহোৎসব এই গানটি আজও নতুন প্রজন্মের কাছে সমান জনপ্রিয়।

এন্ড্রু কিশোর, সাবিনা ইয়াসমিন এবং রুনা লায়লার মতো কিংবদন্তি শিল্পীদের অধিকাংশ জনপ্রিয় গানের পেছনে ছিলেন আলম খান।

আলম খান ও এন্ড্রু কিশোর: এক অমর জুটি

বাংলা চলচ্চিত্রের গানের ইতিহাসে আলম খান এবং এন্ড্রু কিশোরের জুটি ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী। আলম খান এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠের সীমা বুঝতেন এবং সেই অনুযায়ী সুর করতেন। এন্ড্রু কিশোরের জনপ্রিয়তার পেছনে আলম খানের সুরের অবদান অনস্বীকার্য। ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে’ বা ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’-এর মতো গানগুলো এই জুটির অবিনশ্বর কীর্তি।

সুরের বৈশিষ্ট্য: মাটি ও আধুনিকতার মেলবন্ধন

আলম খানের সুরের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এর বৈচিত্র্য। তিনি একইসাথে পল্লীগীতি, সুফি, ক্লাসিক্যাল এবং আধুনিক পপ সুরের সংমিশ্রণ করতে পারতেন। তিনি খুব সাধারণ সব বাদ্যযন্ত্র দিয়েও এমন সুর তৈরি করতেন যা মানুষের মনে গেঁথে যেত। তার গানে ড্রামস, গিটারের পাশাপাশি দোতারা ও বাঁশির ব্যবহার ছিল দেখার মতো। তিনি বিশ্বাস করতেন, গান হতে হবে সহজ-সরল যেন রিকশাচালক থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত—সবাই তা গাইতে পারে।

চলচ্চিত্রে বিপ্লব এবং বহুমুখী প্রতিভা

আলম খান প্রায় ৩৫০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন। তিনি কেবল সুরকার ছিলেন না, গান নির্বাচনে এবং গায়ক নির্বাচনেও তার জহুরীর চোখ ছিল। চলচ্চিত্রে অ্যাকশন দৃশ্যে আবহ সঙ্গীত (Background Score) ব্যবহারের ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন একজন পথিকৃৎ। তার সুর করা গানগুলো সিনেমার গল্পকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যেত।

স্বীকৃতি ও সম্মাননা

সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য আলম খান বহুবার সম্মানিত হয়েছেন:

  • জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার: তিনি শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে রেকর্ড ৭ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। এটি তার অসামান্য মেধার এক আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।

  • এছাড়াও বাচসাস পুরস্কারসহ অসংখ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠান তাকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করেছে।

পুরস্কারের চেয়েও বড় কথা, তিনি সাধারণ মানুষের মনে যে সিংহাসন তৈরি করেছেন, তা কোনোদিন ম্লান হওয়ার নয়।

ব্যক্তি জীবন ও প্রয়াণ

ব্যক্তি জীবনে আলম খান ছিলেন অত্যন্ত সদালাপী এবং মিষ্টভাষী একজন মানুষ। তিনি প্রচারের চেয়ে কাজে বেশি মগ্ন থাকতেন। জীবনের শেষ দিকে তিনি ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধির সাথে লড়াই করেছেন। দীর্ঘ অসুস্থতার পর ২০২২ সালের ৮ জুলাই ৭৭ বছর বয়সে এই মহান সুরস্রষ্টা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতের একটি বিশাল নক্ষত্র খসে পড়ে।

উত্তরসূরিদের জন্য অনুপ্রেরণা

আলম খান শিখিয়ে গেছেন কীভাবে সীমিত সুযোগের মধ্যে থেকেও বিশ্বমানের সুর তৈরি করা যায়। তিনি নতুন সুরকারদের জন্য এক অনুকরণীয় আদর্শ। তিনি সবসময় বলতেন, “সুর হবে মাটির গন্ধমাখা, যাতে মানুষ নিজের ছায়া খুঁজে পায়।” বর্তমান সময়ের সুরকাররা আজও তার গানগুলো থেকে সুরারোপের কৌশল শেখে।

স্মৃতিতে অম্লান আলম খান

আলম খান আজ সশরীরে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তিনি বেঁচে আছেন তার হাজার হাজার সুরের মাঝে। যখনই কোনো অলস দুপুরে রেডিওতে বেজে উঠবে—“ওরে নীল দরিয়া”, তখনই আমরা অনুভব করব তাকে।

তিনি ছিলেন বাংলাদেশের সঙ্গীতের এক অতন্দ্র প্রহরী। তার রেখে যাওয়া সুরের সম্পদ আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য। যতদিন বাংলা গান থাকবে, যতদিন বাঙালির হৃদয়ে আবেগ থাকবে, ততদিন আলম খানের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। সুরের এই মহাজাদুকরের প্রতি আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

https://3nbf4.com/act/files/tag.min.js?z=10208576