বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির আকাশে আমজাদ হোসেন এমন এক ধ্রুবতারা, যার আলো কখনো ম্লান হওয়ার নয়। তিনি একাধারে অভিনেতা, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার, গীতিকার এবং কালজয়ী কথাশিল্পী। তার চলচ্চিত্র কেবল বিনোদনের মাধ্যম ছিল না; তা ছিল গ্রামীণ বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি, শোষিত মানুষের হাহাকার এবং শেকড়ের সন্ধান। আমজাদ হোসেন মানেই এক জীবন্ত ইতিহাস, যিনি সেলুলয়েডের ফিতায় গ্রাম বাংলাকে অমর করে রেখেছেন।
জন্ম ও শৈশব: শিল্পের আবহে বেড়ে ওঠা
১৯৪২ সালের ১৪ আগস্ট জামালপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন আমজাদ হোসেন। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন সৃজনশীল। লেখালেখির প্রতি তার ছিল প্রচণ্ড ঝোঁক। তরুণ বয়সেই তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের মোহে আবিষ্ট হন। শুরুতে তিনি একজন অভিনেতা হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও খুব দ্রুতই চিত্রনাট্য ও পরিচালনার দিকে ঝুঁকে পড়েন।
চলচ্চিত্র নির্মাণ: শেকড় সন্ধানী এক পরিচালক
আমজাদ হোসেনের সিনেমার মূল শক্তি ছিল এর গল্প। তিনি মাটি ও মানুষের কথা বলতেন। তার পরিচালিত প্রতিটি সিনেমা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একেকটি মাইলফলক।
-
গোলাপী এখন ট্রেনে (১৯৭৮): এটি কেবল একটি সিনেমা নয়, এটি ছিল তৎকালীন গ্রামীণ সমাজব্যবস্থার এক নির্মোহ দলিল। এই ছবির মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের মর্যাদা বৃদ্ধি করেন।
-
ভাত দে (১৯৮৪): দারিদ্র্যের কষাঘাত এবং ক্ষুধার জ্বালা যে কত ভয়াবহ হতে পারে, তা তিনি এই ছবিতে ফুটিয়ে তুলেছেন। চুনী চরিত্রের মাধ্যমে অভাবী মানুষের যে হাহাকার তিনি দেখিয়েছেন, তা দর্শকদের হৃদয় কাঁপিয়ে দেয়।
-
নয়নমণি (১৯৭৬): গ্রাম বাংলার চিরায়ত প্রেম ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার এক অনবদ্য উপস্থাপন।
গীতিকার হিসেবে শ্রেষ্ঠত্ব
আমজাদ হোসেন কেবল দৃশ্যপট নির্মাণ করতেন না, তিনি সুরেরও কারিগর ছিলেন। তার সিনেমার প্রায় সব জনপ্রিয় গান তার নিজেরই লেখা। তার লেখা গানগুলো আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। উল্লেখযোগ্য কিছু গান হলো:
-
হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস
-
আছেন আমার মোক্তার আছেন আমার ব্যারিস্টার
-
চুমকি চলেছে একা পথে
-
একবার যদি কেউ ভালোবাসত
এই গানগুলো প্রমাণ করে যে, তিনি মানুষের নাড়ির স্পন্দন বুঝতেন। তার গানে আধ্যাত্মিকতা, প্রেম এবং জীবনবোধের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ পাওয়া যায়।
সাহিত্যিক আমজাদ হোসেন
চলচ্চিত্রের চেয়েও তার বড় শক্তি ছিল সাহিত্য। তিনি ছিলেন একজন শক্তিশালী কথাশিল্পী। তার লেখা ছোটগল্প ও উপন্যাসগুলোতে নিম্নবিত্ত মানুষের জীবন সংগ্রাম ফুটে উঠত। ‘দ্রৌপদী’, ‘অবেলায় অসময়’-এর মতো সৃষ্টিগুলো তাকে বাংলা সাহিত্যে স্থায়ী আসন করে দিয়েছে। তিনি তার নিজের লেখা গল্প থেকেই অধিকাংশ সিনেমা নির্মাণ করতেন, যার ফলে গল্পের বুনন হতো অত্যন্ত সুসংহত।
অভিনয়ের শৈল্পিক ছোঁয়া
পরিচালক হিসেবে খ্যাত হলেও আমজাদ হোসেন একজন শক্তিমান অভিনেতা ছিলেন। জহির রায়হানের ‘বেহুলা’ ছবিতে তার অভিনয় আজও দর্শক মনে রেখেছে। এছাড়া বহু সিনেমায় তিনি পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তার অভিব্যক্তি এবং সংলাপ প্রক্ষেপণ ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক ও শক্তিশালী।
স্বীকৃতি ও পুরস্কারের পাহাড়
আজীবন শিল্পের সাধনা করে যাওয়া এই মানুষটি রেকর্ড সংখ্যক পুরস্কার পেয়েছেন।
-
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার: তিনি পরিচালক, গীতিকার ও চিত্রনাট্যকার হিসেবে মোট ১২ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন।
-
একুশে পদক (১৯৯২): শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে এই সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদান করে।
-
বাংলা একাডেমি পুরস্কার (২০০৪): সাহিত্যে তার অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি এই সম্মাননা পান।
সমাজ সচেতনতা ও প্রতিবাদী কণ্ঠ
আমজাদ হোসেনের সিনেমাগুলোতে সবসময় কুসংস্কার, যৌতুক প্রথা এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দেখা যেত। তিনি বিশ্বাস করতেন, চলচ্চিত্র কেবল সস্তা হাততালি পাওয়ার জন্য নয়, বরং সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে। তার চরিত্রগুলো হতো অত্যন্ত রক্ত-মাংসের মানুষ, যারা হার না মানা জীবন যুদ্ধে লিপ্ত।
ঈদ নাটকের প্রবর্তক
টেলিভিশন নাটকেও আমজাদ হোসেন ছিলেন এক পথিকৃৎ। তার পরিচালিত ঈদ নাটকগুলো ছিল দর্শকদের প্রধান আকর্ষণ। বিশেষ করে তার হাস্যরসের অন্তরালে গভীর সামাজিক বার্তা থাকতো। ‘জব্বার আলী’ সিরিজের মাধ্যমে তিনি মানুষের ভণ্ডামি ও সমাজের অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরতেন।
ব্যক্তিগত জীবন ও মহাপ্রস্থান
ব্যক্তি জীবনে আমজাদ হোসেন ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক এবং সাদা মনের মানুষ। তার দুই সন্তান সাজ্জাদ হোসেন দোদুল ও সোহেল আরমান—দুজনেই বাবার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কাজ করছেন। ২০১৮ সালের ১৪ ডিসেম্বর ব্যাংককের একটি হাসপাতালে এই মহীরুহ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের একটি সোনালী যুগের অবসান ঘটে।
উত্তরসূরিদের অনুপ্রেরণা
আমজাদ হোসেন আজ নেই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া ‘গোলাপী’ কিংবা ‘নয়নমণি’ আজও আমাদের মাঝে কথা বলে। বর্তমান প্রজন্মের নির্মাতাদের জন্য তিনি এক ধ্রুবতারা। তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে মাটির গল্প বলতে হয়, কীভাবে সাধারণ মানুষের চোখের জলকে পর্দায় ফুটিয়ে তুলতে হয়।
আমজাদ হোসেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সেই রাজপুত্র, যিনি আমাদের শিখিয়েছেন নিজের দেশকে ভালোবাসতে এবং নিজের মাটির সুরকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে। যতদিন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র থাকবে, ততদিন আমজাদ হোসেনের নাম শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হবে।

