বাংলাদেশের প্লেব্যাক গানের স্বর্ণযুগের কথা বললে যে কজন শিল্পীর নাম অবলীলায় সামনে আসে, তাদের মধ্যে খালিদ হাসান মিলু অন্যতম। নব্বইয়ের দশকের চলচ্চিত্রের গান মানেই ছিল মিলুর কণ্ঠের জাদুকরী উপস্থিতি। তার কণ্ঠের মধ্যে এমন এক ধরণের করুণ রস এবং মাধুর্য ছিল, যা মুহূর্তেই শ্রোতাদের আবেগপ্রবণ করে তুলত। অকালে চলে গেলেও তার রেখে যাওয়া সুরগুলো আজও আমাদের মাঝে বেঁচে আছে।
জন্ম ও সংগীতে হাতেখড়ি
খালিদ হাসান মিলু ১৯৬০ সালের ৬ এপ্রিল পিরোজপুর জেলার কাউখালীতে জন্মগ্রহণ করেন। এক অত্যন্ত সংস্কৃতিমনা পরিবারে বড় হওয়ায় শৈশব থেকেই সঙ্গীতের প্রতি তার গভীর অনুরাগ তৈরি হয়। তিনি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের কঠোর তালিম নিয়ে নিজেকে একজন দক্ষ শিল্পী হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। তার গায়কীর মূল বৈশিষ্ট্য ছিল নিখুঁত সুরক্ষেপণ এবং কণ্ঠের অবিশ্বাস্য বিস্তার।
চলচ্চিত্রের গানে রাজকীয় যাত্রা
মিলুর ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট ছিল আশির দশকের শেষের দিকে এবং নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে। সেই সময়ে ঢাকাই চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক জগতে এন্ড্রু কিশোরের পাশাপাশি খালিদ হাসান মিলু নিজের একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করে নেন। বিশেষ করে বিরহী এবং রোমান্টিক গানে তার কোনো বিকল্প ছিল না।
আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল, আলাউদ্দিন আলী এবং আলম খানের মতো কিংবদন্তি সুরকারদের প্রিয় পছন্দের শিল্পী ছিলেন তিনি। তার কণ্ঠের গম্ভীরতা এবং আবেগ প্রকাশের ক্ষমতা সুরকারদের নতুন নতুন সুর তৈরিতে অনুপ্রাণিত করত।
কালজয়ী সৃষ্টিসমূহ: মায়াবী সুরের ভাণ্ডার
খালিদ হাসান মিলু তার ক্যারিয়ারে কয়েক হাজার গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। তার জনপ্রিয় গানের তালিকা করতে গেলে অনেক দীর্ঘ হবে, তবে কিছু গান তাকে অমর করে রেখেছে:
১. সেই যে কেন চলে গেলে: বিরহের এই গানটি শুনলে আজও শ্রোতাদের মন বিষণ্ণতায় ভরে ওঠে। এটি মিলুর ক্যারিয়ারের অন্যতম সিগনেচার গান। ২. কত যে তোমাকে বেসেছি ভালো: রোমান্টিক গানের ক্ষেত্রে এটি একটি অনন্য উদাহরণ। ৩. ও সাথীরে যেও না ফেলে: চলচ্চিত্রের পর্দায় এই গানটি দর্শক-শ্রোতাদের চোখের কোণে জল এনে দিয়েছিল। ৪. পৃথিবী তো দু-দিনেরই মেলা: আধ্যাত্মিক এবং জীবনমুখী গানের ক্ষেত্রে মিলু ছিলেন অতুলনীয়। ৫. নীল আকাশের নিচে আমি: পুরনো দিনের গানের নতুন সংস্করণেও তিনি নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছেন।
তার এবং কনকচাঁপার দ্বৈত গানগুলো সেই সময়ে প্রতিটি সিনেমার প্রাণ ছিল। তাদের কণ্ঠের রসায়ন ছিল দর্শক-শ্রোতাদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়।
কণ্ঠের বৈশিষ্ট্য: কেন তিনি অনন্য?
খালিদ হাসান মিলুর কণ্ঠ ছিল প্রাকৃতিকভাবেই দরাজ এবং ভরাট। তিনি খুব সহজে উঁচু স্কেলে গান গাইতে পারতেন। তার গায়কীর একটি বড় দিক ছিল গানের ‘ফিল’ বা ভাব বজায় রাখা। তিনি যখন কোনো দুঃখের গান গাইতেন, মনে হতো কণ্ঠ দিয়ে তিনি কাঁদছেন। এই অকৃত্রিম আবেগই তাকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ের খুব কাছে নিয়ে গিয়েছিল।
আধুনিক গান ও অ্যালবাম
চলচ্চিত্রের বাইরেও আধুনিক গানের অ্যালবামে মিলু ছিলেন সুপারহিট। তার একক অ্যালবামগুলো সেই সময়ে বাজারে আসার সাথে সাথে শেষ হয়ে যেত। ‘মানুষ’, ‘শেষ বিদায়’, ‘প্রতিশোধ’—এমন অসংখ্য অ্যালবামের মাধ্যমে তিনি অডিও বাজার শাসন করেছেন। গ্রামের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে শহুরে ড্রয়িং রুম, সবখানেই বাজত মিলুর গান।
ব্যক্তি জীবন ও পরবর্তী প্রজন্ম
ব্যক্তি জীবনে খালিদ হাসান মিলু ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক এবং প্রচারবিমুখ একজন মানুষ। তিনি নিজের কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকতে পছন্দ করতেন। তার দুই সন্তান—প্রতীক হাসান এবং প্রীতম হাসান। বাবার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে দুজনেই বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতে অত্যন্ত জনপ্রিয়। প্রতীক হাসানের কণ্ঠের মধ্যে বাবার সেই ছায়া খুঁজে পাওয়া যায়, যা শ্রোতাদের বারবার মিলুর কথা মনে করিয়ে দেয়।
অকাল প্রয়াণ ও শূন্যতা
২০০৫ সালের ২৯ মার্চ মাত্র ৪৫ বছর বয়সে এই মহান শিল্পী আমাদের ছেড়ে চলে যান। লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার এই অকাল মৃত্যু বাংলাদেশের সঙ্গীত জগতের জন্য ছিল এক অপূরণীয় ক্ষতি। যে বয়সে একজন শিল্পীর কণ্ঠের পরিপক্কতা সবচেয়ে বেশি থাকে, সেই বয়সেই তিনি বিদায় নিলেন। তার প্রয়াণে বাংলা চলচ্চিত্রের প্লেব্যাক গানের একটি শক্তিশালী স্তম্ভ ভেঙে পড়ে।
স্বীকৃতি ও পুরস্কার
তার অসামান্য গায়কীর জন্য তিনি বহু পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৯৪ সালে ‘হৃদয় থেকে হৃদয়’ চলচ্চিত্রের গানের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ পুরুষ কণ্ঠশিল্পী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়াও তিনি বাচসাস পুরস্কারসহ অসংখ্য বেসরকারি সম্মাননা পেয়েছেন। তবে তার বড় পুরস্কার হলো মানুষের ভালোবাসা, যা আজও কমেনি।
উত্তরসূরিদের জন্য শিক্ষা
খালিদ হাসান মিলু শিখিয়ে গেছেন যে, সস্তা জনপ্রিয়তার চেয়ে মানসম্মত কাজ অনেক বেশি স্থায়ী হয়। তিনি কঠোর পরিশ্রম এবং নিয়মিত রেওয়াজের মাধ্যমে নিজের কণ্ঠকে শানিত রাখতেন। বর্তমানের তরুণ শিল্পীদের কাছে তার গানগুলো হতে পারে সুর এবং ইমোশনের এক বড় শিক্ষা।
স্মৃতিতে ভাস্বর মিলু
খালিদ হাসান মিলু আজ সশরীরে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার কণ্ঠ আছে আমাদের চারপাশে। যখনই কোনো এফএম রেডিওতে বা ইউটিউবে বেজে ওঠে—“কত যে তোমাকে বেসেছি ভালো”, তখনই মিলু ফিরে আসেন আমাদের স্মৃতির পাতায়।
তিনি ছিলেন বাংলা গানের এক নিঃস্বার্থ কারিগর। তার রেখে যাওয়া গানগুলো আমাদের জাতীয় সম্পদ। যতদিন এদেশের মানুষ গান ভালোবাসবে, যতদিন বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস লেখা হবে, ততদিন খালিদ হাসান মিলুর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তার বিদেহী আত্মার শান্তি কামনাই আমাদের একমাত্র প্রার্থনা।

