রুনা লায়লা: সুরের জাদুতে বিশ্বজয়ী এক কিংবদন্তি

রুনা লায়লা: সুরের জাদুতে বিশ্বজয়ী এক কিংবদন্তি

বাংলা গানকে যারা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তাদের মধ্যে রুনা লায়লা অন্যতম। তিনি কেবল বাংলাদেশের নন, বরং সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার এক বিস্ময়কর সঙ্গীত প্রতিভা। তার কণ্ঠের জাদুতে মুগ্ধ হয়েছে ঢাকা থেকে করাচি, কলকাতা থেকে মুম্বাই, এমনকি লন্ডনের রয়্যাল অ্যালবার্ট হলও। কয়েক দশক ধরে তিনি তার সুরের মাধুর্য আর অপ্রতিদ্বন্দ্বী গায়কী দিয়ে সঙ্গীত জগতকে শাসন করছেন।

জন্ম ও শৈশব: সুরের বীজ রোপণ

১৯৫২ সালের ১৭ নভেম্বর সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন রুনা লায়লা। তার বাবা মোহাম্মদ ইমদাদ আলী ছিলেন একজন সরকারি কর্মকর্তা এবং মা আমিনা লায়লা। শৈশবেই তার মেধার প্রকাশ ঘটে। মজার বিষয় হলো, রুনা লায়লা শুরুতে কিন্তু গায়িকা হতে চাননি, হতে চেয়েছিলেন নৃত্যশিল্পী। টানা চার বছর তিনি কত্থক ও ভরতনাট্যম শিখেছিলেন। তবে বড় বোন দিনা লায়লার প্রভাবেই শেষ পর্যন্ত গানের ভুবনে থিতু হন। করাচিতে থাকাকালীন ওস্তাদ হাবিব উদ্দিন খাঁ ও ওস্তাদ আবদুল কাদের খাঁ-র কাছে তার শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের হাতেখড়ি হয়।

শুরুতেই বাজিমাত: করাচি থেকে ঢাকা

রুনা লায়লার পেশাদার সঙ্গীত জীবন শুরু হয় মাত্র ১২ বছর বয়সে। ১৯৬৪ সালে পাকিস্তানি চলচ্চিত্র ‘জুগনু’তে একটি গানে কণ্ঠ দিয়ে তিনি সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন। এরপর করাচির রেডিও ও টিভিতে তার জনপ্রিয়তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। সত্তর দশকের শুরুতে তিনি বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং বাংলা চলচ্চিত্রের গানে নিজের আধিপত্য বিস্তার করেন। তার কণ্ঠের আধুনিকতা এবং স্মার্টনেস বাংলা গানে এক নতুন ধারার সূচনা করেছিল।

গায়কীর বৈচিত্র্য ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি

রুনা লায়লার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার বহুমুখিতা। তিনি ১৮টি ভিন্ন ভাষায় গান গাইতে পারেন, যা একজন শিল্পীর জন্য অত্যন্ত বিরল। তার কণ্ঠের মডুলেশন এবং পারফরম্যান্স শৈলী তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।

  • গজল ও সুফি: রুনা লায়লা গজল গায়িকা হিসেবে উপমহাদেশে অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্রী। মেহেদী হাসানের মতো কিংবদন্তির সাথেও তিনি পাল্লা দিয়ে গেয়েছেন।

  • দামা দাম মাস্ত কালান্দার: এই সুফি গানটি ছাড়া রুনা লায়লার পরিচয় অসম্পূর্ণ। তার এই পরিবেশনা তাকে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি এনে দিয়েছে।

  • বলিউড যাত্রা: ভারতের মুম্বাইয়ে গিয়েও তিনি নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। ‘ও মেরা বাবু চেল চাবিলা’ গানটি তাকে ভারতের মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তোলে। বাপ্পি লাহিড়ী থেকে শুরু করে লক্ষ্মীকান্ত-প্যারেলালের মতো বিখ্যাত সুরকারদের সাথে তিনি কাজ করেছেন।

বাংলা চলচ্চিত্রের উজ্জ্বল নক্ষত্র

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গানে রুনা লায়লা মানেই ছিল গ্যারান্টিড হিট। তার এবং এন্ড্রু কিশোর কিংবা সাবিনা ইয়াসমিনের দ্বৈত গানগুলো আজও ক্লাসিক হিসেবে বিবেচিত।

তার জনপ্রিয় কিছু গান: ১. শিল্পী আমি তোমাদেরই গান শোনাব: এই গানটি তার জীবনের এক প্রকার সিগনেচার টিউন। ২. পাখির বাসার মতো দুটি চোখ: রোমান্টিক গানের এক অনন্য নিদর্শন। ৩. বন্ধু তিন দিন তোর বাড়িতে গেলাম: পল্লীগীতি ঘরানার এই আধুনিক গানটি বাংলাদেশের গ্রাম-গঞ্জের মানুষের মুখে মুখে ফেরে। ৪. জীবন আঁধার যখন হবে: এক গভীর বোধের গান। ৫. সাধের লাউ বানাইলো মোরে: লোকজ সুরকে আধুনিক রঙে রাঙিয়ে তিনি সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।

মঞ্চের জাদুকরী পারফর্মার

রুনা লায়লা কেবল স্টুডিওর শিল্পী নন, তিনি মঞ্চের এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী রানী। মঞ্চে তার মাইক্রোফোন ধরার ভঙ্গি, শাড়ির পরিপাটি ভাঁজ আর চপল হাসি দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। তার প্রতিটি লাইভ শো ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। তিনি যখন মঞ্চে উঠতেন, হাজার হাজার দর্শক একসাথে গেয়ে উঠত—এটিই একজন শিল্পীর সার্থকতা।

সুরকার হিসেবে রুনা লায়লা

দীর্ঘ গায়কী জীবনের পর রুনা লায়লা নিজেকে মেলে ধরেছেন সুরকার হিসেবেও। ২০১৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘একটি সিনেমার গল্প’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি সুরকার হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। এটি প্রমাণ করে যে, সুরের সাথে তার সম্পর্ক কেবল কণ্ঠে নয়, তার রক্তে মিশে আছে।

স্বীকৃতি ও বিশ্ব রেকর্ড

রুনা লায়লার ঝুলি পুরস্কারে কানায় কানায় পূর্ণ। তিনি বহুবার রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা পেয়েছেন:

  • স্বাধীনতা পদক: বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান।

  • জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার: তিনি ৭ বার শ্রেষ্ঠ গায়িকার পুরস্কার লাভ করেছেন।

  • গিনেস বুক অফ ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস: ১৯৮২ সালে ভারতের মুম্বাইয়ে টানা ৩ দিনে ৩০টি গান রেকর্ড করার জন্য তিনি গিনেস বুকে নাম লেখান।

  • সায়গল পুরস্কার (ভারত): ওপার বাংলা থেকেও তিনি সর্বোচ্চ সম্মাননা পেয়েছেন।

ব্যক্তি রুনা ও তার জীবনবোধ

রুনা লায়লা অত্যন্ত শৃঙ্খলাপরায়ণ একজন মানুষ। তিনি সবসময় মনে করেন, নিয়মিত রেওয়াজ আর পরিশ্রম ছাড়া একজন শিল্পী বড় হতে পারে না। তিনি ব্যক্তিগত জীবনেও অত্যন্ত রুচিশীল এবং আভিজাত্যপূর্ণ। তার এই মার্জিত জীবনবোধ তাকে নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কাছে এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।

সুরের আকাশে চিরন্তন শুকতারা

রুনা লায়লা কেবল একটি নাম নয়, তিনি একটি ইতিহাস। বাংলা গানকে তিনি বিশ্বমঞ্চে যে মর্যাদা দিয়েছেন, তা চিরস্মরণীয়। আজ যখন কোনো তরুণ শিল্পী গান শেখা শুরু করে, তার কাছে রুনা লায়লা এক ধ্রুবতারা।

তার গানে যেমন বিরহ আছে, তেমনি আছে জীবনের জয়গান। তার সুরের মূর্ছনা সীমানা ছাড়িয়ে মানুষকে এক সুতোয় বেঁধেছে। যতদিন গান থাকবে, যতদিন সুর থাকবে, ততদিন রুনা লায়লা তার অসামান্য কণ্ঠ দিয়ে আমাদের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন। সুরের এই জাদুকরী রানীর জন্য আমাদের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা অনন্ত।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

https://3nbf4.com/act/files/tag.min.js?z=10208576