বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস যখনই লেখা হবে, সুমিতা দেবীর নাম সেখানে স্বর্ণাক্ষরে খচিত থাকবে। তিনি কেবল একজন অভিনেত্রী ছিলেন না, তিনি ছিলেন এদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের অন্যতম পথিকৃৎ। যখন মুসলিম রক্ষণশীল সমাজে নারীদের রূপালী পর্দায় আসা ছিল কল্পনাতীত, তখন তিনি অসীম সাহস নিয়ে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি ছিলেন আমাদের চলচ্চিত্রের সেই ধ্রুবতারা, যিনি উত্তরসূরিদের জন্য পথ তৈরি করে দিয়ে গেছেন।
জন্ম ও শৈশব: সুরের আবহে বেড়ে ওঠা
সুমিতা দেবী ১৯৩৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন মুন্সীগঞ্জ জেলার লৌহজং উপজেলার কনকসার গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মনাম ছিল হেনা ভট্টাচার্য। অত্যন্ত সংস্কৃতিমনা পরিবারে বড় হওয়ার কারণে ছোটবেলা থেকেই অভিনয়ের প্রতি তার এক সহজাত আকর্ষণ ছিল। জীবনের চড়াই-উতরাই পাড়ি দিয়ে তিনি এক সময় ঢাকায় থিতু হন এবং এদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠেন।
চলচ্চিত্রে অভিষেক: এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা
সুমিতা দেবীর চলচ্চিত্র যাত্রা শুরু হয় ১৯৫৯ সালে ফতেহ লোহানী পরিচালিত কালজয়ী সিনেমা ‘আসিয়া’-র মাধ্যমে। যদিও এর আগে ‘এদেশ তোমার আমার’ ছবিতে তিনি কাজ শুরু করেছিলেন, কিন্তু ‘আসিয়া’ তাকে রাতারাতি জনপ্রিয়তা এনে দেয়। সেই সময়ে সাদা-কালো পর্দায় তার মায়াবী চেহারা আর সাবলীল অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। এরপর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
জহির রায়হানের সাথে জুটি ও জীবন
সুমিতা দেবীর জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের সাথে তার পরিচয়। তারা কেবল কর্মজীবনেই জুটি ছিলেন না, ব্যক্তিগত জীবনেও বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। জহির রায়হানের অনেক কালজয়ী সৃষ্টিতে সুমিতা দেবী কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
-
কাঁচের দেয়াল (১৯৬৩): এই ছবিতে সুমিতা দেবীর অভিনয় ছিল অত্যন্ত উচ্চমানের, যা তাকে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রীর মর্যাদা এনে দেয়।
-
সংগম (১৯৬৪): পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
-
বেহুলা (১৯৬৬): এই ছবিতেও তার উপস্থিতি ছিল নজরকাড়া।
বৈচিত্র্যময় অভিনয় জীবন
সুমিতা দেবী কেবল নায়িকার চরিত্রে সীমাবদ্ধ থাকেননি। তিনি চরিত্রাভিনেত্রী হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ক্যারিয়ারের উত্তরসূরি হিসেবে তিনি মা, খালা বা দাদির চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের চোখের মণি হয়ে উঠেছিলেন। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য কিছু সিনেমা হলো:
-
আকাশ আর মাটি
-
কখনো আসেনি
-
ধীরে বহে মেঘনা
-
ওরা ১১ জন (মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক প্রথম চলচ্চিত্র)
-
সুজন সখী
মহান মুক্তিযুদ্ধে সুমিতা দেবী
সুমিতা দেবী কেবল একজন শিল্পী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান অবিস্মরণীয়। যুদ্ধের সময় তিনি দেশত্যাগ করে কলকাতায় চলে যান এবং সেখানে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সাথে যুক্ত হন। তিনি সেখানে নিয়মিত নাটকে অভিনয় করতেন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহ জোগাতেন। যুদ্ধের সেই কঠিন সময়ে একজন নারী শিল্পী হিসেবে তার এই সাহসী ভূমিকা আজও আমাদের গর্বিত করে।
চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রযোজনা
সুমিতা দেবী কেবল পর্দার সামনেই নন, পর্দার আড়ালেও সক্রিয় ছিলেন। তিনি চলচ্চিত্র প্রযোজনার সাথে যুক্ত ছিলেন। তার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘সুমিতা দেবী প্রোডাকশন’ থেকে বেশ কিছু মানসম্মত কাজ হয়েছে। এছাড়া তিনি রেডিও এবং টেলিভিশনেও নিয়মিত কাজ করতেন। তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি প্রায় ২০০টিরও বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন।
ব্যক্তিগত সংগ্রাম ও দৃঢ়তা
সুমিতা দেবীর জীবন ছিল সংগ্রামের এক নামান্তর। জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়ার পর তিনি একাই তার সন্তানদের বড় করেছেন। শোবিজের চাকচিক্যময় জীবনের আড়ালে তাকে অনেক ব্যক্তিগত দুঃখ ও একাকীত্বের মোকাবিলা করতে হয়েছে। কিন্তু তিনি কখনোই ভেঙে পড়েননি। তার ব্যক্তিত্ব এবং আভিজাত্য তাকে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক অনন্য মর্যাদা দিয়েছিল।
স্বীকৃতি ও সম্মাননা
চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের জন্য সুমিতা দেবী বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন:
-
নিগার পুরস্কার: তৎকালীন পাকিস্তানের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র পুরস্কার (আসিয়া ছবির জন্য)।
-
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি (বাচসাস) পুরস্কার।
-
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির আজীবন সম্মাননা।
-
জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার: চলচ্চিত্রে বিশেষ অবদানের জন্য তাকে সম্মানিত করা হয়।
শেষ জীবন ও মহাপ্রস্থান
সুমিতা দেবী জীবনের শেষ দিনগুলো বেশ নিরিবিলিতে কাটিয়েছেন। ২০০৪ সালের ৬ জানুয়ারি ঢাকার একটি হাসপাতালে এই কিংবদন্তি অভিনেত্রী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের একটি আদি ও সোনালী অধ্যায়ের অবসান ঘটে। মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।
উত্তরসূরিদের প্রেরণা
আজকের বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে যারা কাজ করছেন, তাদের জন্য সুমিতা দেবী এক আদর্শ। তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যে থেকেও নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে হয় এবং শিল্পের প্রতি একনিষ্ঠ থাকতে হয়। তিনি ছিলেন আমাদের রূপালী পর্দার প্রথম রানী, যার রাজত্ব কোনোদিন শেষ হওয়ার নয়।
সুমিতা দেবী আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তার অভিনীত ‘আসিয়া’ বা ‘কাঁচের দেয়াল’ আজও আমাদের প্রেরণা দেয়। বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাস যতবার চর্চিত হবে, সুমিতা দেবীর নাম ততবারই অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হবে।

